বৃহস্পতিবার ০২ ডিসেম্বর ২০২১

| অগ্রাহায়ণ ১৮ ১৪২৮

মহানগর নিউজ :: Mohanagar News

প্রকাশের সময়:
২০:৩৪, ১৯ অক্টোবর ২০২১

নিজস্ব প্রতিবেদক :

বন্দরের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ অবকাঠামো- ‘বে-টার্মিনাল’

প্রকাশের সময়: ২০:৩৪, ১৯ অক্টোবর ২০২১

নিজস্ব প্রতিবেদক :

বন্দরের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ অবকাঠামো- ‘বে-টার্মিনাল’

চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা নানা সীমাবদ্ধতায় শেষ প্রান্তে এসে ঠেকেছে। অথচ চট্টগ্রাম বন্দরই দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল রাখার একমাত্র ক্ষেত্র। তাই এটিকে সচল ও সক্ষম করতে পরিকল্পনা নেওয়া হয় বে-টার্মিনাল প্রকল্পের। হালিশহর সৈকত এলাকা ঘেঁষে এ টার্মিনাল নির্মাণ হলে চট্টগ্রাম বন্দর পরিণত হবে বিশ্বমানের বন্দরে। ইতোমধ্যে ভূমি অধিগ্রহণ শেষে ২৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এ টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে। বলা যায়, বন্দরের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ অবকাঠামো হবে এই বে-টার্মিনাল।

চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান অবস্থা ও বে-টার্মিনালের বাস্তবতা প্রসঙ্গে কথা হয় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন) জাফর আলমের সাথে। তিনি বলেন, 'পোর্ট মূলতঃ তিন রকমের। প্রথমটি গ্রে টার্মিনাল, দ্বিতীয়টি কনটেইনার পোর্ট ও তৃতীয়টি হলো ডিপ সি পোর্ট। চট্টগ্রাম বন্দর একসময় গ্রে পোর্ট ছিল। তা ধাপে ধাপে কনটেইনার পোর্টে রূপ নেয়। ফলে এর ধারণক্ষমতার চেয়ে কাজের চাপ বেড়ে যায়। এটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তাই আমরা মাতারবাড়ি ডিপ সি পোর্টের মতো পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল ও বে-টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছি। বে-টার্মিনাল হলে চট্টগ্রাম বন্দর অনেক বেশি সক্রিয় হয়ে উঠবে।

তিনি আরও বলেন, 'বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে সাড়ে ৯ মিটার গভীর ও ১৯০ মিটার দৈর্ঘ্যের চেয়ে বড় জাহাজ প্রবেশ করতে পারে না। নতুন টার্মিনাল চালু হলে ভিড়তে পারবে ১২ মিটার গভীরতা ও ২৮০ মিটার পর্যন্ত দৈর্ঘ্যের জাহাজ। এছাড়া কর্ণফুলী নদীর জেটিতে পৌঁছাতে একটি জাহাজকে ১৫ কিলোমিটার ভেতরে প্রবেশ করতে হয়। কিন্তু বে টার্মিনাল হলে তা শূন্য কিলোমিটারের মধ্যেই বার্থিং করতে পারবে। বন্দরের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বিদ্যমান পোর্ট জেটিতে একসঙ্গে ১৬টি জাহাজ বার্থিং করা গেলেও বে টার্মিনালে গড়ে প্রায় ৫০টি জাহাজ বার্থিং করা যাবে। ফলে বন্দরে প্রতিবছর যে পরিমাণ আমদানি-রপ্তানি পণ্য হ্যান্ডলিং হচ্ছে, বে-টার্মিনালে হ্যান্ডলিং হবে তার চেয়ে পাঁচগুণ বেশি।

চট্টগ্রাম বন্দরের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এই বে-টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। বে-টার্মিনাল প্রকল্পটির অধীনে ব্যাকআপ ফ্যাসিলিটিজসহ ৫৮৩ মিটার দীর্ঘ কনটেইনার জেটি, ২২০ মিটার দীর্ঘ ডলফিন জেটি, ৮৯ হাজার বর্গমিটার আরসিসি ইয়ার্ড, ২ হাজার ১২৮ বর্গমিটার কনটেইনার শুল্ক স্টেশন, ২ হাজার ১৫০ মিটার লম্বা ও ৬ মিটার উচ্চ কাস্টম বন্ডেড হাউস, ২ হাজার ৫০০ মিটার রেলওয়ে ট্র্যাক, ৪২০ মিটার ফ্লাইওভার, ১ হাজার ২০০ বর্গমিটার মেকানিক্যাল ওয়ার্কশপ এবং ৫ হাজার ৫৮০ বর্গমিটারের অফিস ভবন নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে ১৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে রেলওয়ে সংযোগ লাইনের কাজটি করছে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল। এই রেলওয়ে সংযোগ লাইনের দৈর্ঘ্য হবে ৪ দশমিক ১৫ থেকে ৪ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার। বে-টার্মিনাল চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান অবকাঠামোর চেয়ে প্রায় পাঁচগুণ বড়। চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান অবকাঠামো ৪৫০ একর জমির ওপর।

বে-টার্মিনাল প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, ওপেন সি-পোর্ট হিসেবে বে-টার্মিনাল নির্মিত হলে হাজার বছরের চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের সক্ষমতা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে। এটি হবে বন্দরের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ অবকাঠামো। দেশের ক্রমবর্ধমান আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের চাহিদা ও চাপ সামাল দিতে সক্ষম হবে এই টার্মিনাল। তাই আমরা চাই বন্দর তাদের দক্ষতা দিয়ে এ বে-টার্মিনাল প্রকল্পের কাজ শেষ করুক। এতে দেশীয় অর্থনীতি আরও গতিশীল হবে।

বন্দর সূত্রে জানা গেছে, এরই মধ্যে বিদেশি সাতটি প্রতিষ্ঠান বে-টার্মিনাল নির্মাণের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এগুলো হচ্ছে পোর্ট অব সিঙ্গাপুর অথরিটি (পিএসএ), সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ড, সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে, ভারতের আদানি গ্রুপ, ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস, চীনের চায়না মার্চেন্টস গ্রুপ ও দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই গ্রুপ। তবে এখনও পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠানকে এ প্রকল্পের কাজ দেওয়া হয়নি।

বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম. শাহজাহান বলেন, প্রধানমন্ত্রী অগ্রাধিকারভিত্তিতে বে-টার্মিনাল প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছেন। এটি বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আমরা পেয়েছি। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কনসালট্যান্ট নিয়োগ করা হবে। বে-টার্মিনালের পরামর্শক নিয়োগের জন্য ছয়টি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দিয়েছে। এই ছয়টি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবনা যাচাই-বাছাই শেষে আমরা আগামী নভেম্বরের মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দিতে পারব বলে আশা করছি।

জমি অধিগ্রহণ জটিলতা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত প্রায় ৭ বছর পর জমি বরাদ্দের অনুমোদন দেওয়া হয়। চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গা-হালিশহর এলাকায় সাগর উপকূল ঘেঁষে বে-টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ব্যক্তি মালিকানাধীন ৮৭১ একর জমি ছাড়াও সমুদ্রে জেগে ওঠা আরও ১ হাজার ৬০০ একরসহ ২ হাজার ৫০০ একর জমিতে টার্মিনাল নির্মিত হবে।

সরেজমিনে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে দেখা যায়, হালিশহরের চৌচালা থেকে চট্টগ্রাম ইপিজেড পর্যন্ত সৈকত এলাকাজুড়ে চলছে এই বে-টার্মিনালের কর্মযজ্ঞ। পাওয়ার স্টেশন নির্মাণ ও মাটি ভরাটের কাজ প্রায় শেষ হলেও, বর্তমানে চলছে বাঁধ নির্মাণের কাজ। মাটি ভরাটের কাজ করছে মায়ার লিমিটেড, ওয়েস্টার্ন মেরিন ও সাইফ পাওয়ারটেক। অল্প শ্রমিক দিয়েই ঢিলেঢালাভাবে চলছে বাঁধ ও রেন্টাল ওয়াল নির্মাণের কাজ।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক বলেন, এই বে-টার্মিনালে মূলতঃ তিনটি টার্মিনাল হবে। এরমধ্যে একটি চট্টগ্রাম বন্দর করবে এবং অন্য দুইটি বিদেশি বিনিয়োগকারী করবে। এখন প্রকল্পের কাজ গুছিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়ার পর পুরাদমে কাজ শুরু হবে। এবং এ কাজ নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করা হবে।

 

মহানগর নিউজ/এসবি/আরসি