বৃহস্পতিবার ০২ ডিসেম্বর ২০২১

| অগ্রাহায়ণ ১৮ ১৪২৮

মহানগর নিউজ :: Mohanagar News

প্রকাশের সময়:
১৪:২৫, ২৩ নভেম্বর ২০২১

রশীদ এনাম

১ম মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণ

কীর্তিমান পুঁথি গবেষক ইসহাক চৌধুরী

প্রকাশের সময়: ১৪:২৫, ২৩ নভেম্বর ২০২১

রশীদ এনাম

কীর্তিমান পুঁথি গবেষক ইসহাক চৌধুরী

পুঁথি গবেষক ইসহাক চৌধুরী

চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়, বিচ্ছেদ নয়, চলে যাওয়া মানে বন্ধন ছিন্ন করা, আদ্র রজনী চলে গেলে আমারও অধিক কিছু থেকে যাবে, আমার না থাকা জুড়ে জানি চরম সত্যের কাছে নত হতে হয় সবাইকে- রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ’র চরণগুলি বাস্তব জীবনের কথা বলে। সত্যি আমাদের জীবনটা সমুদ্রের পানে উড়ে যাওয়া গাঙচিলের মতো, কখনও বা ফিনিক্স পাখির মতো।  এলো বুঝি  গেলো। মাঝখানে শুধু ক্ষণিক সময়টুকু। 
মানুষ বেঁচে থাকে তাঁর কর্মে, সৃজনশীলতা ও ভালো কাজের গুণে। বাতিঘরের প্রদীপ যেমন আলো ছড়িয়ে চারদিকে আলোকিত করে ঠিক তেমনি একটা সময় নিভে যায়। 

নিভে যাওয়া এক জলন্ত প্রদীপ শিখা পুঁথি গবেষক ইসহাক চৌধুরী। যার সৃষ্টি কর্ম জিয়ন কাঠি পুরোধা আলোকিত করতে সফল ব্যক্তিদের মাঝে আলো ছড়াতে নিজেকে সার্বক্ষণিক নিয়োজিত রেখেছিলেন সৃজনশীল কাজে। গুণীজন পুঁথি গবেষণার কাণ্ডারি ইসহাক চৌধুরী নেই কিছুতে বিশ্বাস হয় না। তিনি বেঁচে থাকবেন লক্ষ কোটি মানুষের হৃদয়ে।

জন্ম ও পারিবারিক তথ্য 

ইসহাক চৌধুরী ৩০ শে জুন ১৯৫২ সালে পটিয়া দক্ষিণ হুলাইন গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা পুঁথিগবেষক ও সংগ্রাহক আবদুস সাত্তার চৌধুরী, মাতা ছবিলা খাতুন,  পিতা আবদুস সাত্তার চৌধুরী পেশায় একজন শিক্ষক। ১৯৮২ সালে তিনি মালেকা বেগমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তিন কন্যা ও এক পুত্র সন্তানের জনক। 

পড়ালেখা 

পটিয়া লড়িহরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পড়া লেখার হাতে খড়ি, হাবিলাসদীপ ইশকুল থেকে এসএসসি, সালেহ নুর কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবলিওগ্রাফার হিসেবে চাকরিত যোগদান করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে- পুঁথি গবেষণার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। বাংলা বিভাগে অধ্যায়নের সময় লেখাপড়া অনেকটা ইতি টানলেও বই পোকা হয়ে ইতিহাস ও লোকসাহিত্যর অলিতে গলিতে চষে বেরিয়েছেন। লোকসাহিত্যের পুরোধা ব্যক্তিত্ব ইসহাক চৌধুরীকে আমরা দেখি একজন বৌদ্ধিক আলোকিত ভালো মানুষ হিসেবে ।  

বিবলিওগ্রাফার ও পুঁথি গবেষকের কীর্তি

ইসহাক চৌধুরী মূলত পিতার কাছে পুঁথি পাঠে হাতেখড়ি। পিতার অনুপ্রেরণায় নিজের মেধাও মননে  পুঁথি সংগ্রহ ও সংরক্ষনে উৎসাহিত হন। তিনি একাধারে বিবলিওগ্রাফার,পুঁথি গবেষক, লেখক ও মালঞ্চ সংগঠক- পুঁথি নিয়ে  জীবনের সাথে খেলা করা ছিল তাঁর নেশা। সংগ্রহ সংরক্ষণ থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকশান অফিসার পদে চাকরিরত অবস্থায় নিয়মিত লিখেছেন চট্টগ্রামে জাতীয় দৈনিক পত্রিকায়।

দেশবরেণ্য পুঁথি সংগ্রাক পুঁথির যাদুকর আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদের কাছের আত্মীয় এবং উত্তরসূরীও বটে। পুঁথিগবেষক আবদুস সাত্তার চৌধুরী ইন্তেকালের পরে নিজে পুঁথির সাগরে সাঁতরে বেড়িয়েছেন। বাবার কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে, গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল ও জনপদে পুঁথি সংগ্রহের জন্য সাহিত্যর প্রতিটি ক্ষেত্রে বিচরণ করেছেন। 

ইসহাক চৌধুরী ছিলেন লোকসাহিত্যর কিংবদন্তি অনেকটা জীবন্ত অভিধান বলা যায়। পিতা ও নিজের সংগৃহিত পুঁথি নিয়ে নিজেই গড়ে তুলেছেন এক বিশাল সংগ্রহশালা। যে সংগ্রহ শালায় বৃটিশ আমলে পটিয়া কাগজী পাড়ায় হাতে তৈরি কাগজ পর্যন্ত সংরক্ষণ করে রেখেছেন। 
ইসহাক চৌধুরী পুঁথি গবেষণার কাজে উৎসাহ দিয়ে গেছেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুলতান আহমেদ এবং অধ্যাপক ডক্টর মনিরুজ্জামান স্যার। 

একদা পটিয়া ইতিহাসবিদ অধ্যাপক আবদুল করিমের স্মরণ সভায় ডক্টর মনিরুজ্জামান স্যার ইসহাক চৌধুরীকে নিয়ে মন্তব্য করে বলেন, আমি ডক্টর অধ্যাপক হতে পারি কিন্তু আমার চেয়েও অনেক বড় হলো আমার ইসহাক চৌধুরী । তাঁর পুঁথি গবেষণা ও লোক সাহিত্য ও ইতিহাস বিষয়ে পাণ্ডিত্য আমাকে মুগ্ধ করে ইসহাক চৌধুর পুঁথিগবেষণায় পাণ্ডিত্য আজও আলো ছড়াচ্ছে । 

ইসহাক চৌধুরী বলতেন, সাহিত্য চিন্তা মানুষের মৌলিক চিন্তা। এটা লোকজীবনের প্রথম যাত্রা। প্রমথ চৌধুরী যেমন বলতেন, কলম থেকে কথা আসে না, কথা থেকে কলমে আসে তেমনি যত বেদ আর অবস্থার সৃষ্টি হোক সেটি আর মানুষ ছাড়া মূল্য কই ? পুঁথি সাহিত্য নিবেদিত প্রাণ হিসেবে সর্বশেষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন ইসহাক চৌধুরী। 

লোকসাহিত্য কর্মের স্বীকৃতি  

পুঁথিগবেষণা ও লোকসাহিত্যর জন্য চট্টগ্রাম একাডেমি পদক, চট্টগ্রাম শিল্পকলা পদক, আবদুল হক চৌধুরী পদক, একুশে বই মেলা পরিষদ চট্টগ্রাম কর্তৃক সম্মাননা, প্রিন্সিপাল আবুল কাশেম পদক, পটিয়া মালঞ্চ পদকসহ আরো বিভিন্ন সংগঠন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে লোক সাহিত্য কর্ম ও গবেষণা কাজের জন্য স্বীকৃতি ও বিশেষ সম্মাননা পেয়েছেন।

স্বভাব ও জীবনাচার 

পুঁথিগবেষক ইসহাক চৌধুরী নিজ গ্রামে বড় হয়েছেন তাঁর গ্রামীণ জীবনযাপন ছিল পছন্দের। কখনও শহরে থাকতেন না। বেশ মিষ্টভাষীও ছিলেন। খুব সহজেই মানুষকে আপন করে নিতেন। মানুষের সুখে দুঃখে পাশে থাকতেন। খুব সাদামাটা জীবন যাপন করতেন। বেশ ধার্মিকও ছিলেন। এতিম খানার ছাত্রদের খাওয়াতে পছন্দ করতেন। অতিথি আপ্যায়ন এবং প্রিয়জনদের দাওয়াত করে খাওয়ানো ছিল বড় গুণ। 

বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলা একাডেমি থেকে তাঁর সংগ্রহশালা পরিদর্শনে গেলে সবাইকে নিজের বাড়িতে সাদরে দাওয়াত করে নিয়ে যেতেন। বই পড়তে বেশ পছন্দ করতেন কখনও পরিবারের সদস্যদের সাথে অভিমান হলে তিনি বই নিয়ে বসে যেতেন। বই ছিল ওনার কাছে মনের ধাওয়াই মতো।

আমার অনুভূতিতে পুঁথিগবেষক ইসহাক মামা 

১৯৯৬ সালের ৩০  সেপ্টম্বর খুব সম্ভবত আবদুল করিমের সাহিত্যবিশারদের মৃত্যুবার্ষিকী। পটিয়া সুচক্রদন্ডী গ্রামে সাহিত্য বিশারদ বাড়িতে গিয়েছিলাম মালঞ্চ–-র পক্ষ থেকে ফুল নিয়ে। পুঁথিগবেষক ইসহাক চৌধুরীর সাথে প্রথম পরিচয়। হাসিমুখে খুব বিনয়ের সহিত আদুরে ও স্নেহমাখা পিতৃতুল্য সুরে বলল, রশীদ এনাম বাড়ি কোথায় ? পড়া লেখা কোথায় ? কি করছি কি লিখতে পছন্দ কর ইত্যাদি । ওনার একটা কথা আমার খুব মনে পড়ছে, তিনি বলতেন পড়া লেখার কোন বিকল্প নেই। লিখতে হলে কিন্তু বই পড়া চাই। যত বেশি পড়া হবে তত বেশি লেখা যাবে।

আমার লেখার লেখির হাতেখড়ি মাত্র। মালঞ্চের সাহিত্য সভাগুলো তিনি নিয়মিত হাজির থাকতেন। আমরা স্বরচিত লিখা নিয়ে যেতাম। লেখাগুলো সাহিত্য সভায় পাঠ করতাম। লেখাগুলো বিশ্লেষণ করে তাৎক্ষণিক শুদ্ধ করে দিতেন ইসহাক মামা। উৎসাহ অনুপ্রেরণা করতে কখনও কৃপণতা করতেন না। দৈনিক আজাদীতে, দৈনিক পূর্বকোণে, সুপ্রভাত বাংলাদেশের বিভিন্ন বিভাগে আমার লেখা, গল্প, ফিচার ছাপা হলে তিনি বলতেন, রশীদ এনাম তোমার গল্পটা বেশ ভালো হয়েছে। আমি অবাক হতাম তিনি মালঞ্চ কর্মীদের লেখাগুলো মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়তেন।

ইসহাক চৌধুরী আমার বড় খালু আব্বা প্রয়াত প্রকৌশলী গাজী এখলাছ মামাকে খুব ভালো করে চিনতেন জানতেন, খালু আব্বার ছোট ভাই অধ্যাপক ডক্টর আবুল কালাম আজাদ মামার সাথে বেশ ভালো সম্পর্ক ছিল। সেই সুবাধে আমি ইসহাক চৌধুরীকে মামা ডাকতাম, তিনিও আমাকে ভাগিনা বলে সম্বোধন করতেন। রক্তের চেয়েও আত্মার আত্মীয় হয়ে গেলেন ইসহাক মামা। সাহিত্য আড্ডা, পারিবারিক ও সামাজিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ইসহাক মামার  দেখা হলে আড্ডায় বসে যেতাম। 

দৈনিক পূর্বকোণে একসময় “শহর থেকে দূরে একটা বিভাগ ছিল, মোজাম্মেল মাহামুদ ভাই দেখতেন। ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে লিখতে বসলে অনেক সময় তথ্য উপাত্ত-র জন্য ইসহাক মামার ধারস্ত হতাম। কোন শব্দ  না বুঝলে কিংবা  লোক সাহিত্য বিষয়ক তাঁর কাছ থেকে আমি জানতাম।  বলা যায়  ইসহাক মামা ছিলেন আমার কাছে এক জীবন্ত অভিধান।

বই পৃষ্ঠা না উল্টিয়ে যিনি চট করে বলে দিতেন, মেজবান ফারসী শব্দ, জোড়খাঁই- বাদ্য যন্ত্র, চাষ খোলা থেকে চক্রশালা, পট, পটুয়া, পট্রি, পট্রদেবী, পইট্যা থেকে যে পটিয়া এসব ইসহাক মামার কাছ থেকে জেনেছি। এক সাহিত্য আড্ডায় আমার লেখা ছোট গল্প নিয়ে প্রয়াত কবিয়াল এস এম নুরুল আলম, ইসহাক চৌধুরী মামা, খুব  প্রশংসা করলেন, মামা সেদিন বলেছিলেন, তুমি ছোট গল্প নিয়মিত পড়, লেখা ছাড়বে না একদিন গল্পকার হতে পারবে। মনের চিত্র পটে কিংবা মনের আঙ্গিনায় যা লিখা আসে সাথে সাথে তা লিখে ফেলবে ডায়েরির পাতায়। লিখে যাও অবিরত তোমরাই হবে আগামী দিনের লেখক। 

গল্প হোক আর টল্প হোক লেখালেখির চর্চা যাতে থেমে না যায়। ২০১৬ সালে বলাকা প্রকাশন থেকে বই বের হওয়ার পর যখন আমি ইসহাক মামাকে বই উপহার দিলাম তিনি আনন্দ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। মনে হচ্ছিল তিনি যেন বই প্রকাশ করেছেন। খুব খুশি হয়ে বললেন, প্রথম বই প্রকাশনা মানে প্রথম সন্তানের জন্ম দেয়ার মতো। এটি যত্ন করে হৃদয়ে লালন পালন করতে হবে। তিনি আরও বলেন, মালঞ্চ কর্মী শিবু, রশীদ এনাম-র যখন বই বের হয়, তখন মনে হয়  যেন নিজে বই  বের  করেছি। 

ইসহাক মামাকে বলতাম, মামা আপনি পুঁথি গবেষণা, সংগ্রহশালা নিয়ে একটা বই করেন। ইসহাক মামাকে বলতেন ভাগিনা করব। এক  গোধূলি  বেলায়  হঠাৎ আগুন্তকের মতো আমার বাড়িতে এসে হাজির। আমি খুব বিস্মিত হলাম, মামা আপনি আমাদের বাড়ি চিনলেন কিভাবে ? মামা হাসিমুখে বললেন, না চিনার কি আছে ভাগিনা। মামার সঙ্গে বসে আমার জীবন সঙ্গিনী ও আমার বাবাসহ অনেক আড্ডা দিলাম।

মামা এসেছিলেন, ২য় কন্যার বিয়ের হবু  পাত্রের খোঁজ নিতে। চা নাস্তা খেতে খেতে বললেন, মানুষের বাহ্যিক সৌন্দর্য আসল সৌন্দর্য নয়, মানুষের আত্মার সৌন্দর্য আসল। বাবা মাকে নিয়ে একান্নবর্তী পরিবারের বন্ধন ধরে রাখার উপদেশ দিলেন । 

আমাদের পরিবার দেখে তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন। আমার পার্টনারকে বললেন, মা জননী  শ্বশুর-শাশুড়িকে নিয়ে এক সঙ্গে   থাকার মধ্যে একটা আনন্দ আছে সুখ আছে। সেটা  নিজের পরিবার মনে করে  রেখো সারাজীবন।  আমার মেয়ের শুভ আকিকায় মালঞ্চ- থেকে প্রকাশিত “আদরের কথা মালায়” তিনি লিখেছিলেন, “সুহৃদ রশীদ এনামের কন্যা হুজাইফা রশীদ বর্ণ নক্ষত্রের ন্যায় আলো ছড়াক নবীন পৃথিবীতে। মুখরিত করুক পাখিদের সাথে সবুজ শ্যামল এই ধরিত্রী”।

পটিয়ার নিয়ে আমার একটা বই প্রকাশ করার কথা ছিল। বইয়ের পাণ্ডুলিপিও তিনি খুব যত্ন সহকারে দেখেছেন। বইটা প্রকাশের অপেক্ষায়। ইসহাক মামার সাথে অনেক স্মৃতি আছে। স্মৃতির ঝাঁপি মেলে ধরলে সে অনেক কথা। মালঞ্চের বর্ষাকালীন কোন এক সাহিত্য  আড্ডা।  “বাদলা দিনে” নামক ছোট গল্প লিখেছিলাম । সাহিত্য আড্ডাটা বসেছিল, মুন্সেফ বাজারস্থ সমবায় ব্যাংকের  নিচতলার ঝরাজীর্ণ ছোট একটা কক্ষে। সাহিত্য আড্ডার শুরু হওয়ার সাথে  আকাশ ঝাঁকিয়ে বৃষ্টি নামল। ইসহাক মামা বৃষ্টিতে কাক ভেজা হয়ে একাকার। 

সাহিত্য আড্ডায়  সেদিন আমি সবাইকে একটা করে ফলজ ও ঔষধি গাছ উপহার দিয়েছিলাম। ইসহাক মামা আড্ডা শেষে বললেন, বাদলা দিনে সাহিত্য আড্ডায় গাছের চারা উপহার এ যেন বৃষ্টির পানি মিশ্রিত এক আনন্দ সুধা উপহার  পরম পাওয়া। আমাকে বললেন,  তোমার এত সুন্দর আইডিয়া কিভাবে মাথায় এলো ? বাদলা দিনের সাহিত্য আড্ডা সার্থকতা বাড়িয়ে দিল গাছের চারা। মামাকে বললাম ,গাছ লাগিয়ে সবার মনকে সবুজ করতে চাই। প্রকৃতি কাছে গেল নাকি মানুষ সবুজ হয়। মামা হেসে বললেন ঠিক !

পটিয়া উপজেলা পরিষদ হলরুমে, মা দিবস নিয়ে বর্ণের হাতে খড়ি ও একাত্তরের শহীদ ছবুর ফেসবুক গ্রুপের আয়োজনে ,মা কে নিয়ে স্মৃতি কথা বলতে গিয়ে  আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন ইসহাক মামা। শিশুদের মতো হাউ মাউ করে অজোরে কাঁদতে থাকেন। হলভর্তি দর্শক ও অতিথিরা সবাই কেঁদেছিলেন ইসহাক মামার কান্না দেখে। মা কে না জানি তিনি ভালোবাসতেন ? অনেক সময় মায়ের আবদার পূরণ করতে না পারা এবং অসুস্থ মাকে ভালো  চিকিৎসা করতে না পারার ব্যথা বয়ে বেড়িয়েছেন।

সবাইকে বলেন, বাবা মায়ের চেয়ে পৃথিবীতে আপন আর কেউ নেই। তোমরা আগামী প্রজন্মরা বাবা মায়ের মনে কখনও কষ্ট দিও না। বাবা মায়ের সেবা করার জন্য সবাইকে আহ্বান জানান। 

ইসহাক চৌধুরীর সর্বশেষ প্রকাশিত লেখা ছিল আমার স্বরচিত “চাটগাঁইয়া মেজ্জান” বইয়ের চমৎকার আলোকপাত  লেখাটি দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ ও টইটম্বুর ম্যাগাজিনের অক্টোবর -২০ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। ইসহাক মামাকে বললাম, আমার বইটি মন্ত্র মুগ্ধ হয়ে যে রিভিউ করেছেন সত্যি প্রশংসার দাবিদার এবং আমি কৃতজ্ঞও বটে।  

আলোকপাতে পুরো বই-র ঘটনা যেন জলছবির মতো ভেসে উঠেছে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় সর্বশেষ প্রকাশিত লেখাটি যে ছাপা হয়েছে সেটা মুঠো ফোনে জানিয়েছিলাম । ইসহাক মামা বললেন, ভাগিনা বাড়ি আসলে আমার জন্য টইটম্বুর সংখ্যাটা নিয়ে এসো মনে করে ।

আমার ছেলে ফারুকের বদলিটা যেভাবে হোক তুমি করে দিও । আমার শরীর ভালো যাচ্ছে না, ছেলেকে বিয়ে শাদীর কথা চলতেছে। মামাকে কথা দিলাম মামা, ফারুক আমার ভাই তাকে বদলি করার দায়িত্ব আমার। এটা নিয়ে আপনি আমাকে অনুরোধ করলে আমি খুব কষ্ট পাব। আমি প্রতিজ্ঞা করলাম, ফারুকের বিষয়টা আমি দেখব। ইসহাক মামা কুক কুক কাশতে লাগলেন। আমি দোয়া চাইলাম। তিনি বললেন তোর জন্য আমার অন্তরের অন্তস্থল সবসময়  দোয়ার বৃষ্টি বর্ষিত হয়। এটাই ছিল ইসহাক মামার সাথে আমার সর্বশেষ কথা মৃত্যুর ঠিক এক সপ্তাহ আগে।
 
ইসহাক চৌধুরী যেভাবে চলে গেলেন  

২২ নভেম্বর ইসহাক মামার শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। কনিষ্ঠ কন্যা নাইমাকে ডেকে বললেন, খাতা কলম নিয়ে এসো মা, চট্টগ্রামের লোকসাহিত্যর আঞ্চলিক বেশ কিছু প্রবচন লেখালেন। গভীর রাত, টিনের চালের উপর টুপটাপ কুয়াশার ফোঁটা পড়ার শব্দ, গ্রামের বেওয়ারিশ কুকুরগুলো চিৎকার করে কাঁদছে, কি বিশ্রী আওয়াজ। কুহ্ কুহ্ কুহ্ করে নিম চড়ুই ডাকছে। কুয়াশার শুভ্র চাদর চুমিয়ে যাচ্ছিল পৃথিবীকে, হিম হিম ঠাণ্ডা। ইসহাক মামার শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল, মাঝে মাঝে কাশি উঠছে । পাশে স্ত্রী ও কন্যারা বসে আছে নাইমার ভয়ে গা ছমছম করছে।

২৩নভেম্বর সকালে পটিয়া হাসপাতালে যাওয়ার জন্য উঠোনে পা বাড়ালেন, ইসহাক মামার পা যেন চলছে না। বার বার পিছু ফিরে দেখছে, প্রিয়তমা জীবনসঙ্গিনীকে বললেন দোয়া করিও। মামা হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেলেন। বললেন, আমি ঢাকায় প্রশিক্ষণ থেকে বাড়ি ফিরে দেখলাম আমার আমার মা জননী না ফেরার দেশে চলে গেলেন। অসুস্থ মায়ের পাশে থাকতে না পারার ব্যথাটা আজও ভুলিনি। তোমরা আমার জন্য অনেক টাকা পয়সা খরচ করছো। সেদিক দিক থেকে আমি ভাগ্যবান। তোমাদের মায়ের দিকে খেয়াল রাখিও।

ইসহাক মামাকে পটিয়া হাসপাতাল থেকে এ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে যাওয়া হল চট্টগ্রামের ডেল্টা ক্লিনিকে, তারপরে সার্জিস্কোপ-২ ক্লিনিকে। অক্সিজেন দেয়া হলো। ফারুকের হাত ধরে রাখলেন। ইসহাক মামা এ্যাম্বুলেন্সে খুব স্পষ্ট করে পড়তে লাগলেন, আল্লাহ এক, আল্লাহ এক। কাকে যেন সালাম দিলেন। কলমায়ে শাহাদাত পাঠ করলেন। অক্সিজেন উঠানামা করছে, আইসিউতে নেয়ার কিছুক্ষণ পর সন্ধ্যা ৭.৩০ মিনিটে ডাক্তার জানিয়ে দিলেন দুঃখিত দেশবরেণ্য পুঁথি গবেষক ইসহাক চৌধুরী না ফেরার দেশে। নাইমা ও ফারুকের বাবা বাবা বলে চিৎকার করে হাউ মাউ করে কাঁদতে লাগলেন।

চট্টগ্রাম থেকে সোনার বাংলা করে ২৩ নভেম্বর ঢাকা ফিরছিলাম, রাত ৮টায়  আফরোজা ফোনে জানাল,  “ইসহাক মামা আর নেই”। শোনা মাত্রই মনে হলো ট্রেনটা যেন থেমে যাচ্ছে । আমি কিছুটা বাকরুদ্ধ! চোখের কোণে জল গড়িয়ে পড়ল, ইসহাক মামা নেই মানে? ফোনটা কেটে গেল। কুঝিক কুঝিক করে ট্রেন ছুটে চলেছে,, ভাবছি জীবনটা রেলগাড়ির মতো সময়ে অসময়ে ছুটে চলা কখনও তার গন্তব্যে শেষের ঠিকানায়  চিরতরে চলে যাওয়া। জীবনের শেষ স্টেশনে এসে চিরতরে থেমে যায় রেলগাড়ি।

আহ জীবন প্রিয় ইসহাক মামা অতীত হয়ে গেল, ঢাকা পৌছা পর্যন্ত ট্রেনের বগিতে বসে কেঁদেছি মামা নেই, আমার জীবন্ত বাতিঘরটা নিভে গেল। কে আমাকে অনুপ্রেরণা দিবে কে আমার লেখা এডিট করে দিবে। মামা কেন এত তাড়াতাড়ি আপনার চলে যাওয়া ? আপনার বউ মাকে নিয়ে বাসায় যেতে বলেছিলেন  দাওয়াত দিয়েছিলেন কত । মামা আমার যাওয়া হয়নি জীবন বাস্তবতার তাগিদে। ক্ষমা করবেন মামা আমাকে।

পুঁথিগবেষক ইসহাক চৌধুরী গ্রামীণ লোকসাহিত্য, ইতিহাস, পুঁথিগবেষণা বিবলিওগ্রাফার হিসেবে সংগ্রাম ও সাধনা  করে গেছেন। কীর্তিমান ইসহাক চৌধুরীরা কখনও মরেন না, মানুষের  হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন। একজন সফল ও বিজ্ঞ হিসেবে তাঁর জিয়নকাঠির স্পর্শে পুরোধা বিজয়ী ভালো মানুষের ভিড়ে বেঁচে থাকবে অনন্তকাল। ১ম মৃত্যুবার্ষিকীতে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে ফরিয়াদ করি কীর্তিমান ও দীপ্তিমান ইসহাক চৌধুরীকে জান্নাতের বাগানের ফুল ফুটিয়ে রাখুন। আমিন !
 

লেখক ও প্রাবন্ধিক