বৃহস্পতিবার ০২ ডিসেম্বর ২০২১

| অগ্রাহায়ণ ১৮ ১৪২৮

মহানগর নিউজ :: Mohanagar News

প্রকাশের সময়:
২১:৫৫, ১৮ নভেম্বর ২০২১

আলমগীর মোহাম্মদ

বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে চবি নিয়ে আমার ভাবনা

প্রকাশের সময়: ২১:৫৫, ১৮ নভেম্বর ২০২১

আলমগীর মোহাম্মদ

বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে চবি নিয়ে আমার ভাবনা

ছাপ্পান্নতম বর্ষে পদার্পণ করলো আমাদের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় নানা জনের লেখা পড়লাম। বেশিরভাগই গর্ব ক’রে লেখা। বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা অর্জন, চবি থেকে পাস করে কয়জন সচিব হয়েছিলেন এরকম তথ্যও ছিল একজনের লেখায়। মোটামুটি স্তুতিমূলক লেখায় ভরা ছিল সাবেক শিক্ষার্থীদের ফেসবুক ওয়াল। তবে কি আমরা ভিন্নভাবে ভাবতে পারি না?

আসুন কিছু গঠনমূলক সমালোচনা করি। নানা কারণে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার গুণগত মান কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি। এই লেখায় আমরা মূল সমস্যাগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করব।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অন্যতম সমস্যা হলো আবাসন সংকট। সুদূর চট্টগ্রাম শহর থেকে যাতায়াত করে প্রত্যেকদিন ক্লাস করা এক অর্থে অসম্ভব। একই কথা শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। একটা সম্পূর্ণ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে যাবতীয় সম্ভাবনা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আছে। দরকার কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা। আবাসন সংকট সমাধান করা গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ আরো সুন্দর হবে। শিক্ষক শিক্ষার্থীদের পক্ষে কাছাকাছি আসার একটা সুযোগ তৈরি হব। শুধু ক্লাস আওয়ারে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজকর্ম শেষ হয়ে যায় না। আবাসন সংকট নিরসনের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য সংস্কৃতির চর্চার সুযোগ আরো বাড়তো।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটলের কথা দেশে বিদেশে অনেকেরই কৌতুহলের বিষয়। চবির সাবেক-বর্তমান অনেকে এ নিয়ে অহংকার করে থাকেন যে দেশের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় চবি যাদের যাতায়াতের জন্য শাটল আছে। কিন্তু, এই শাটলের পরিবেশ কেমন, শিক্ষার্থীদের কী পরিমাণ কষ্ট করে ক্যাম্পাসে যেতে হয় সেটা ওখানকার শিক্ষার্থী না হলে বুঝা যায় না। পুরনো, অপরিস্কার, লক্কর ঝক্কর বগি দিয়ে চালানো হয় শাটল ট্রেন। পর্যাপ্ত সংখ্যক বগি না থাকায় এক জায়গায় গাদাগাদি করে বসে, দাঁড়িয়ে, হেলান দিয়ে যাতায়াত করতে হয় শিক্ষার্থীদের। ফাগুনের গরমে তো অনেকের হিটস্ট্রোক করার অবস্থা হয়। কর্তৃপক্ষের উচিত শীঘ্রই চবি শিক্ষার্থীদের অহংকার শাটলের উন্নয়নে ব্যবস্থা নেওয়া। এতে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হবে, দূর শহর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা উপভোগ্য হবে। 

দীর্ঘদিন ধরে চবির বেশ কয়েকটি বিভাগে সেশন জট বিদ্যমান। সেশন জটের অন্যতম কারণ হলো শিক্ষক স্বল্পতা, শিক্ষকদের আন্তরিকতার ঘাটতি, শিক্ষকদের দলাদলি, ক্লাসবিমুখতা এবং সর্বোপরি ছাত্র রাজনীতি। রাজনৈতিক সুপারিশ নিয়ে নিয়মিত পরীক্ষার রুটিন থামিয়ে বিশেষ পরীক্ষায় বসা সেশন জট বৃদ্ধির জন্য অনেকটা দায়ী। সেশন জট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি। হাজার হাজার শিক্ষার্থীর জীবন থেকে দুই-তিন বছর কেড়ে নেওয়া একটা জাতীয় ক্ষতি। প্রয়োজনীয় প্রদক্ষেপ নিয়ে সেশন জট নিরসন করা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের ফর‍য দায়িত্ব। 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ অনিন্দ্য সুন্দর। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা যাচ্ছে কাঠামোগত উন্নয়নের নামে গণহারে বৃক্ষনিধন হয়েছে। এটা বন্ধ করা জরুরি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণে প্রশাসনের উচিত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্রপরিষদ- চাকসু নির্বাচন হয় না দীর্ঘদিন। এই কারণে ছাত্রদের মধ্যে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা একেবারে নেই বললেই চলে। অথচ ছাত্রদের অধিকার আদায়ের জন্য এই প্ল্যাটফর্ম একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারতো। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত অতিদ্রুত চাকসু নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। 

বাংলাদেশের তৃতীয়তম প্রাচীন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ছাত্র-শিক্ষক মিলনায়তন নেই। অথচ একটা টিএসসি হতে পারতো ছাত্র-শিক্ষকের সত্যিকার সম্মিলন। এখন শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক অনেকটা দাপ্তরিক। টিএসসি প্রতিষ্ঠা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক আরো উন্নত হবে। শিক্ষা, গবেষণা ও সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক চর্চা বাড়বে। উইলিয়াম জি স্পেডি (১৯৯৪) প্রণীত আউটকাম বেইজড এডুকেশন কার্যকরের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো শিক্ষক-শিক্ষার্থীর  সুসম্পর্ক স্থাপন ও উভয়ের মধ্যে কমিউনিটি ফিলিংস নিশ্চিত করা। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সুন্দর সম্পর্ক শিক্ষার পরিবেশকে অনেকাংশে প্রভাবিত করে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক বর্তমান শিক্ষার্থীদের এই প্রাণের দাবি পূরণে কর্তৃপক্ষ সোচ্চার হবে বলে আমরা আশা করি। 

উপরোক্ত বিষয়গুলো ছাড়াও আরো বেশকিছু বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আন্তরিক পদক্ষেপ জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়ে  ছাত্রদের মধ্যে রাজনৈতিক সহাবস্থান নিশ্চিত করা, শিক্ষার্থীদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ করা, র‍্যাগিং বন্ধ করা, বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠকে আধুনিকায়ন করা, জোবরাবাসীর সাথে মত বিনিময়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সৃষ্ট দূরত্ব ঘুচানো, বিশ্ববিদ্যালয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসার পরিবেশ নিশ্চিত করা। প্রভৃতি কাজ দ্রুত হবে বলে আমরা আশা করি। 

লেখক : শিক্ষক ও অনুবাদক || প্রাক্তন শিক্ষার্থী || ৪৫ তম ব্যাচ || ইংরেজি বিভাগ।

মহানগর নিউজ/এআই