বুধবার ১৯ জানুয়ারি ২০২২

| মাঘ ৬ ১৪২৮

মহানগর নিউজ :: Mohanagar News

প্রকাশের সময়:
০৭:০০, ১৪ জানুয়ারি ২০২২

বিশেষ প্রতিনিধি

ফের আলোচনায় ‘লকডাউন’—পুরোনো ক্ষতের মধ্যেই নতুন আতঙ্ক

প্রকাশের সময়: ০৭:০০, ১৪ জানুয়ারি ২০২২

বিশেষ প্রতিনিধি

ফের আলোচনায় ‘লকডাউন’—পুরোনো ক্ষতের মধ্যেই নতুন আতঙ্ক

লকডাউন

করোনা সংক্রমণের উর্ধ্বগতির বিষয়টি মাথায় রেখে দেশজুড়ে নতুন করে আরোপ করা হয়েছে বিধিনিষেধ। নতুন বছরের শুরুতেই তাই আবার আলোচনায় উঠে এসেছে ‘লকডাউন’। একদিকে আগেরবারের লোকসানের ধাক্কা সামলানোর আগেই লকডাউন নিয়ে নতুন করে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে বিধিনিষেধ শুরু দিনেই শ্রমিকসংশ্লিষ্ট একটি সংগঠনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে গেল লকডাউনে বড় ক্ষতির তথ্য।

জানা যায়, বিশ্বজুড়ে বড় আতঙ্কের নাম এখন করোনাভাইরাসের নতুন ভ্যারিয়েন্ট ‘ওমিক্রন’। দেশে দেশে করোনার এই নতুন ধরন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে লাফিয়ে বাড়ছে ওমিক্রন আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। বাংলাদেশেও ইতোমধ্যে শনাক্ত হয়েছেন বেশ কয়েকজন ওমিক্রন আক্রান্ত রোগী।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যেই নিজেদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। নড়েচড়ে বসেছে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরও। আজ (বৃহস্পতিবার) থেকে ১০ দফা বিধিনিষেধ কার্যকর হয়েছে সারাদেশে।

এদিকে করোনার প্রথম ধাক্কা সামলানোর আগেই ওমিক্রন সংক্রমণ বাড়ার খবরে দেশের অর্থনীতিতে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী- অধিকাংশ ব্যবসায়ীর মধ্যে এখন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। চাকরিজীবী ও শ্রমজীবী মানুষের কপালেও পড়েছে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনার প্রথম ধাক্কার পর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে রয়েছে দেশ। ঠিক সেই মুহূর্তে আবার করোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় চাপে পড়তে পারে অর্থনীতি।

এরআগে গেল লকডাউনে বড় ধরনের লোকসানের ঝড় বয়ে যায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ে নিয়োজিত লাখ লাখ ব্যবসায়ীর ওপর। দোকানপাট বন্ধ থাকায় একদিকে বিপাকে পড়েন মালিকেরা, অন্যদিকে অনেক কর্মচারী চাকরি হারিয়ে পড়েন আর্থিক সংকটে।

এদিকে লকডাউন নিয়ে নতুন করে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন। 

তিনি বলেন, সর্বশেষ লকডাউনের সময় বাড়ি ফেরা শ্রমিকদের ১০ শতাংশ আর কাজে ফেরেনি। আমরা (ব্যবসায়ীরা) লকডাউন নিয়ে শঙ্কিত।

লকডাউন সবকিছু স্থবির করে দেয় উল্লেখ করে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, গেল বছর লকডাউনে ১৫ দিন গার্মেন্টস কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। লকডাউনের পরে কারখানা চালু হলেও ১০ শতাংশ শ্রমিক আর কাজে ফেরেনি। তাই লকডাউন গ্রহণযোগ্য না। বরং আমাদের চেষ্টা করতে হবে কোডিভ-১৯ প্রতিরোধ করে কিভাবে বেঁচে থাকা যায়। সেই প্রস্তুতি নিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণরোধে গণসচেতনতার বিকল্প নেই। লকডাউন অর্থনীতির জন্য বিরাট ক্ষতি, তাই লকডাউন না দিয়ে সচেতনতা বাড়ানো দরকার। যে দেশ বেশি লকডাউনে গেছে, সেই দেশ বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

শ্রমিকদের ওপর লকডাউনের প্রভাব : যা আছে ‘বিলসে’র প্রতিবেদনে

সম্প্রতি দেশের শ্রমজীবীদের ওপর লকডাউনের প্রভাব নিয়ে একটি গবেষণা চালায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)। বৃহস্পতিবার (১৩ জানুয়ারি) রাজধানীতে গবেষণার ফল নিয়ে আয়োজিত এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়।

‘ঢাকা শহরের পরিবহন, দোকান-পাট এবং হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতের শ্রমিকদের ওপর সাম্প্রতিক লকডাউনের প্রভাব নিরূপণ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, করোনা মহামারিতে পরিবহন, দোকান-পাট এবং হোটেল-রেস্তোরাঁয় চাকরি হারিয়েছেন ৮৭ শতাংশ শ্রমিক। তাদের ৭ শতাংশ এখনও বেকার। গড়ে এসব মানুষের আয় কমেছে ৮ শতাংশ। 

গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২১ সালের লকডাউনে (৫ এপ্রিল থেকে ১০ আগস্ট) ৮৭ শতাংশ শ্রমিকের চাকরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি (৯৫ শতাংশ) পরিবহন খাতের শ্রমিকদের চাকরি গেছে। দোকানপাট শ্রমিকদের ৮৩ শতাংশ এবং হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতের শ্রমিকদের ৮২ শতাংশ কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। লকডাউন পরবর্তী সময়ে ৯৩ শতাংশ শ্রমিক চাকরিতে পুনর্বহাল হয়েছেন। ৭ শতাংশ শ্রমিক এখনও বেকার।

তবে লকডাউনে এসব খাতে খণ্ডকালীন শ্রমিকদের কর্মসংস্থান বেড়েছিল ২১৫ শতাংশ। লকডাউনে তিনটি খাতে কার্যদিবস কমেছিল ৭৩ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি ৯২ শতাংশ কার্যদিবস কমেছে পরিবহন খাতে। লকডাউন পরবর্তী সময়ে অবশ্য কাজের চাপ বেড়েছে। ফলে কার্যদিবস এবং কর্মঘণ্টা আগের তুলনায় বেড়েছে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, লকডাউনে তিনটি খাতের শ্রমিকদের আয় গড়ে ৮১ শতাংশ কমেছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি (৯৬ শতাংশ) ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন পরিবহন খাতের শ্রমিকরা। এছাড়া হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতের শ্রমিকদের আয় কমেছে ৮৩ শতাংশ। লকডাউনের আগে যেখানে মাসে গড় আয় ছিল ১৩ হাজার ৫৭৮ টাকা, লকডাউন তা নেমে এসেছিল ২ হাজার ৫২৪ টাকায়। লকডাউন পরবর্তী সময়ে আয় দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৫২৯ টাকা। অর্থাৎ লকডাউন পরবর্তী সময়েও ৮ শতাংশ আয়ের ঘাটতি রয়েছে।

লকডাউনে শ্রমিকদের পরিবারে আয় ও ব্যয়ের ঘাটতি ছিল প্রায় ৭৭ শতাংশ। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৯৭ শতাংশ পরিবহন খাতের শ্রমিকদের এবং সর্বনিম্ন ৪৬ শতাংশ খুচরা দোকান বিক্রেতা খাতের শ্রমিক পরিবারের। ২০ শতাংশ শ্রমিক পরিবার সম্পত্তি বিক্রয়, খাবার কমিয়ে দেওয়া এবং সন্তানদের কাজে পাঠানোর মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। এছাড়া ৮০ শতাংশ শ্রমিক পরিবার ধার করে এবং সঞ্চয় কমিয়ে নিজেদের ব্যয় নির্বাহ করছেন। লকডাউন পরবর্তী সময়ে সঞ্চয় কমেছে ৬৪ শতাংশ এবং সঞ্চয়কারীর সংখ্যা কমেছে ৫০ শতাংশ।

এছাড়া লকডাউনে তিনটি খাতের শ্রমিকদের মাত্র ১ শতাংশেরও নিচে সরকারি বিভিন্ন সহায়তা পেয়েছেন। এরমধ্যে রয়েছে কম মূল্যে খাদ্য সহায়তা এবং নগদ টাকা। 

গবেষণা অনুযায়ী, ৩৬ শতাংশ শ্রমিক করোনা প্রতিরোধক টিকা নিয়েছেন এবং ৬৪ শতাংশ শ্রমিক এখনও টিকার আওতার বাইরে।

প্রসঙ্গত, দেশে করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়া ও ওমিক্রনকে ঘিরে সতকর্তার অংশ হিসেব আজ (বৃহস্পতিবার) থেকে আবার শুরু হয়েছে বিধিনিষেধ। সোমবার (১০ জানুয়ারি) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে। গণপরিবহন চলাচল বাদে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ওই ১১ দফা নির্দেশনার বাকি ১০ দফা আজ থেকেই কার্যকর হয়।

মহানগরনিউজ/এমএন