বুধবার ১৯ জানুয়ারি ২০২২

| মাঘ ৬ ১৪২৮

মহানগর নিউজ :: Mohanagar News

প্রকাশের সময়:
২১:১০, ২৫ নভেম্বর ২০২১

নিজস্ব প্রতিবেদক

রেলের পয়েন্টসম্যান ও মাস্টারের দ্বন্দ্ব–মাশুল গুনছেন যাত্রীরা

প্রকাশের সময়: ২১:১০, ২৫ নভেম্বর ২০২১

নিজস্ব প্রতিবেদক

রেলের পয়েন্টসম্যান ও মাস্টারের দ্বন্দ্ব–মাশুল গুনছেন যাত্রীরা

পয়েন্টসম্যানদের বিক্ষোভ মিছিল

পূর্বাঞ্চল রেলের লাকসাম জংশন-দেশের বৃহত্তম ৫টি জংশনের একটি। যে জংশন দিয়ে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে যাচ্ছে প্রায় ২০ জোড়া ট্রেন। এক কথায় পূর্বাঞ্চল রেলের প্রবেশদ্বার বলা হয় এ লাকসামকে। তবে স্টেশনে কর্মরত কর্মীদের দ্বন্দ্বের কারণে ভেঙে পড়েছে স্টেশনের সিস্টেম। আর এ দ্বন্দ্বের জেরে এ স্টেশনে সম্প্রতি টানা দুই ঘন্টা আটকা পড়ে একটি যাত্রীবাহী ট্রেন। এছাড়া রেষারেষির কারণে অন্য একটি ট্রেনের (হুপার গাড়িতে) ভুল জায়গায় তেলের ট্যাংক বসানোর ঘটনাও ঘটেছে!

লাকসাম রেলস্টেশন সূত্র জানায়, গত ১৯ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহ থেকে চট্টগ্রামগামী ‘নাসিরাবাদ এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি লাকসাম স্টেশনে প্রবেশ করে সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে। ওই দিন এ ট্রেনে কন্ট্রোল অর্ডার ছিল লাকসাম থেকে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী পাঠাতে হবে একটি ‘ডেড ইঞ্জিন’। যা সংযোজনে সময় প্রয়োজন সর্বোচ্চ ২০ মিনিট। কিন্তু ইঞ্জিনটি সংযোজন করতে সেদিন সময় লাগে প্রায় ২ ঘন্টা। এ সময় ভোগান্তিতে পড়ে যাত্রীরা।

এ ঘটনার দুইদিন পর লাকসাম স্টেশনে কন্ট্রোল অর্ডার আসে একটি হুপার গাড়িতে লাগাতে হবে তেলের ট্যাংক। এ কাজে সময় প্রয়োজন মাত্র ১০ মিনিট। কিন্তু সেখানে কর্মরতদের ‘অদক্ষতায়’ তা বসিয়ে দেওয়া হয় ভুল জায়গায়। পরে ট্রেন চালকের তোপের মুখে ট্যাংক খুলে লাগানো হয় সঠিক জায়গায়। এতে ১০ মিনিটের কাজ শেষ করতে সময় লেগে যায় পুরো দেড় ঘন্টা!

এসব ঘটনার বিষয়ে জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলে একে অন্যের ঘাড়ে দায় চাপিয়েছেন স্টেশনে কর্মরতরা। পরস্পর বিরোধী বক্তব্যের জেরে এ স্টেশনে যাত্রাবিরতিতে অতিরিক্ত সময় ব্যয়, কন্ট্রোল অর্ডার বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও এ রুটে ট্রেন চলাচল বিলম্ব হওয়ার কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা চালায় মহানগর নিউজ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি বছরের মার্চে লাকসাম স্টেশন মাস্টারের ‘অসৌজন্যমূলক’ আচরণের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করে পয়েন্টসম্যানরা (পি-ম্যান)। পি-ম্যানদের দাবি এরপর থেকেই এ স্টেশনে পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন খাতে সংকট সৃষ্টি করছেন স্টেশন মাস্টার শাহাবউদ্দিন। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ‘ভুল বুঝিয়ে’ এ স্টেশনে কর্মরত পি-ম্যানদের নানা অজুহাতে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে ব্রাঞ্চ লাইনে। এতে লোকবল সংকটের মুখে যাত্রীবাহী ট্রেন সান্টিং, ট্রেনে পিএলসি দেওয়া, পয়েন্ট তৈরিসহ বিভিন্ন কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি হচ্ছে। এতে চলাচলের পথে ট্রেন ‘আটকা’ পড়ছে লাকসামে। তবে এ বিষয়টি অস্বীকার করেছে রেলওয়ে কর্মকর্তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পি-ম্যান মহানগর নিউজকে বলেন, ‘সান্টিং পরিচালনার জন্য লাকসামে একজন ইয়ার্ড মাস্টার ও দুজন ইয়ার্ড ফোরম্যান ছিল। বর্তমানে লাকসামে কোন ইয়ার্ড মাস্টার নেই। ইয়ার্ড ফোরম্যানদের মধ্যে একজন আছেন। তা-ও অনভিজ্ঞ। সান্টিংয়ের কাজ পি-ম্যান দ্বারা সম্পন্ন করা হয়। তাছাড়া লাকসামের চারপাশে স্টেশন বন্ধ থাকায় ট্রেনে পিএলসি দিতে হয়। লাকসাম একটি বড় জংশন। এখানে ৪০টি পয়েন্ট আছে। কখনও ট্রেন পয়েন্ট বা ট্র্যাক ফেল করলে পয়েন্ট বানাতে হয় এবং পাইলিং করতে হয়। দক্ষ জনবল না থাকায় কাজগুলো ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে যারা দক্ষ তাদের আক্রোশমূলক বদলি করা হচ্ছে।’

ট্রাফিক বিভাগের তথ্য ঘেঁটে দেখা গেছে, লাকসাম ইয়ার্ড ও কেবিনে পি-ম্যানদের ১৪টি মঞ্জুরীকৃত পদের বিপরীতে কাগজে কলমে কর্মরত আছেন ১২ জন। তারা হলেন- জসিম উদ্দিন, আব্দুর রশিদ, জিয়াউল করিম, মুস্তাফিজুর রহমান, মনিরুল ইসলাম, সেফায়েত উল্লাহ, মো. সাব্বির, এনায়েত উল্লাহ, মনিরুল ইসলাম, হাবিবুর রহমান, ঝিন্টু বড়ুয়া, আবুল কালাম।

সম্প্রতি ৩টি কন্ট্রোল অর্ডারের প্রেক্ষিতে চাঁদপুর মেহের স্টেশনে পাঠিয়ে দেওয়া হয় পি-ম্যান হাবিবুর রহমানকে। একইভাবে ঝন্টু বড়ুয়াকে পাঠানো হয় কসবা ও আবুল কালামকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় শশীদল ব্রাঞ্চ লাইনে।

তবে সব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন স্টেশন মাস্টার শাহাবউদ্দিন। তিনি বলেন, ‘লোকবল সংকট আছে। তবে যা আছে তা দিয়ে চলছে।’ 

সম্প্রতি নাসিরাবাদ এক্সপ্রেস ট্রেন দুই ঘন্টা অবরুদ্ধ থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওইদিন অনেক কাজ ছিল। এগুলো করতে সময় নষ্ট হয়েছে।’ পি-ম্যানদের সাথে বিরোধের জেরে সংকট সৃষ্টি হয়েছে কি’না প্রশ্নের উত্তরে, দেখা করার অনুরোধ জানিয়ে ফোন কেটে দেন তিনি।

একইভাবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সহকারি চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান। তবে চলতি বছরের মার্চে পি-ম্যানদের বিক্ষোভ মিছিলের কথা স্বীকার করেছেন তিনি। রেলওয়ের এ কর্মকর্তা মহানগর নিউজকে বলেন, ‘নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আমাদের অনেক লোক অবসরে যাচ্ছেন। যার কারণে একটু চাপ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু পি-ম্যানদের মধ্যে কয়েকজন কাজ করতে চায় না। এমনকি লাকসামে স্টেশন মাস্টারের ওপর তারা হামলাও করেছে।’

পি-ম্যান ও স্টেশনের মাস্টারের বিরোধের জেরেই যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়ছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ ধরণের কোন ঘটনা ঘটেনি। এ সময় (১৯ সেপ্টেম্বর) একটি ট্রেনের ইঞ্জিন ফেল করেছিল। নাসিরাবাদ ট্রেন থেকে ওই ট্রেন বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এ কারণে সেদিন লেট হয়েছিল।’

মহানগর নিউজ/এপি/এসএ