বৃহস্পতিবার ০২ ডিসেম্বর ২০২১

| অগ্রাহায়ণ ১৮ ১৪২৮

মহানগর নিউজ :: Mohanagar News

প্রকাশের সময়:
২০:১৬, ১৭ অক্টোবর ২০২১

মেহেদী হাসান কামরুল : 

‘পিতার কাঁধে সন্তানের লাশের চেয়ে ভারী আর কিছু না’ 

প্রকাশের সময়: ২০:১৬, ১৭ অক্টোবর ২০২১

মেহেদী হাসান কামরুল : 

‘পিতার কাঁধে সন্তানের লাশের চেয়ে ভারী আর কিছু না’ 

মো. ফারুক (২৫)

নানার বাড়ি থেকে বাবার কাছে গতকাল শনিবার বেড়াতে আসেন মো. ফারুক (২৫)। বিকালে বাবার ছোট্ট পান-বিড়ির দোকানেও বসেছিলেন। বাবার সাথে রাত পর্যন্ত দোকানেই ছিলেন। কাজেও সহায়তা করেন। সবকিছু ঠিক ছিল। কিন্তু সকালটা আর শুভ হয়নি ফারুকের জন্য। রবিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে নগরীর বায়েজিদ থানার বালুচরা কাশেম কলোনিতে গ্যাস সঞ্চালন লাইনে বিস্ফোরণে দেয়ালচাপায় ফারুকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। তার এই অকালমৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না ফারুকের পরিবার ও এলাকাবাসী।

ফারুকের ষাটোর্ধ্ব পিতা রবিউল আলম কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, ‘আমি বাপ, আমার কাছেই মনে হয় মউত আছিল। আমার কাছে এসেই মারা গেল। এ বুঝি আমার কপালের লিখন!’ 

রবিউল আলম আরও বলেন, ‘গতকাল রাতে একসাথে দোকান বন্ধ করে বাসায় গেছি। বাসায় ফিরে একসাথে রাতের খাবার খেলাম। আজ আমাকে ছেড়ে চিরতরে চলে যাবে জানলে আরেকটু বেশি করে খেতে দিতাম। ছেলেটা আমাকে ফেলে চলে গেল। এ ভার আমি সইবো কি করে!’

তিনি বলছিলেন, ‘ফারুককে নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন ছিল। আমি অসুস্থ মানুষ। ছোট্ট একটা পানের দোকান দিয়ে সংসার চালাতাম। ফারুক দর্জির কাজ করত। আমাকে সাহায্য-সহযোগিতা করত। আমরা ওর বিয়ের কথা ভাবছিলাম। একদিন ডেকে বললাম, বাবা বিয়ের উপযুক্ত হয়ে গেছ। তোমার জন্য পাত্রী দেখতে হবে। আমরাও পাত্রী দেখছিলাম। কিন্তু ফারুত কোনো মতামত জানায়নি। হয়তো তার আজকের এই করুণ পরিণতির কথা সে আগে থেকেই আঁচ করতে পেরেছে। আমি যে বড় নিঃস্ব হয়ে গেলাম। এতদিন শুনেছি পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী বস্তু পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ। আজ সত্যি মনে হচ্ছে, পিতার কাঁধে সন্তানের লাশের চেয়ে ভারী আর কিছু হতে পারে না।’

নিহত ফারুকের ছোট বোন বলেন, আমার ভাই সকালে নাস্তা খেয়ে গলির ভেতরে হাঁটাহাঁটি করছিল। হঠাৎ বিকট শব্দ শুনতে পাই। ছুটে গিয়ে দেখি ভাইয়া রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে আছে। আমার ভাইয়ার মাথা থেকে কখনও টুপি নামত না। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত। কেন আমার ভাইয়ের এমন মৃত্যৃ হলো! আমার ভাইয়া তো কখনও কারো কোনো ক্ষতি করেনি। এ কেমন শাস্তি! ভাইকে ছাড়া সামনের দিনগুলো আমি কি করে থাকব!

এদিকে ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে লোকাল থানা পুলিশ, সিআইডি, বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), র‌্যাব, ফায়ার সার্ভিস ও কর্ণফুলী গ্যাস কর্তৃপক্ষ। তারা বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে। 

সরেজমিনে দেখা যায়, তিনতলা একটি ভবনের নিচে দুইপাশে অন্ততঃ ৮-১০টি কক্ষ। যেখানে দিনের বেলায়ও বাতি নিয়ে প্রবেশ করতে হয়। দেখে মনে হবে, অন্ধকার ভূতের গলিতে মানুষের বসবাস। তার পাশে রয়েছে বিশাল একটি কলোনি। যেখানে রয়েছে অন্ততঃ দেড়শ’ টিনের ঘর ও বস্তি। এসব ঘর থেকে লাখ লাখ টাকা ভাড়া আদায় করেন মালিক মো. খপছুর আলম। কিন্তু তিনি ভাড়াটিয়াদের সুরক্ষায় কোনো ব্যবস্থা নেননি। পিতা আবুল কাশেমের নামে গড়ে তোলা কলোনির ওই বস্তিতে হাঁটা-চলারও সুযোগ নেই। বড় কোনো অগ্নিকাণ্ড ঘটলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি মূল সড়কে রেখে আসতে হবে। বড় কোনো দুর্ঘটনায় ব্যাহত হতে পারে উদ্ধার কাজ। 

পুলিশের কাউন্টার টেররিজমের পরিদর্শক আফতাব হোসেন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্যরা প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করেছে। সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে আমাদের মনে হয়েছে, গ্যাস চেম্বার থেকে লিকেজ হয়ে বদ্ধ কক্ষে এই ঘটনা ঘটেছে। আমরা কোনো বিস্ফোরক কিংবা বিস্ফোরণের আলামত পাইনি। নাশকতামূলক কোনো কিছুর অস্তিত্ব মেলেনি।

 দুর্ঘটনাকবলিত কক্ষে ভ্যান্টিলেশন নেই :

দুর্ঘটনাকবলিত কক্ষ ও আশেপাশের কক্ষগুলো পরিদর্শন শেষে কর্ণফুলী গ্যাস কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন অনিয়ম দেখতে পায়। সংস্থাটি জানায়, কক্ষটিতে কোনো ধরনের ভ্যান্টিলেশন ব্যবস্থা ছিল না। কক্ষে পর্যাপ্ত আলো বাতাস প্রবেশেরও ব্যবস্থা নেই। বদ্ধ এক একটি কক্ষ যেন বিস্ফোরণের উৎসস্থল। এ রকম বদ্ধ কক্ষে গ্যাস দুর্ঘটনা যে কোনো মুহূর্তে ঘটতে পারে। 

কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশনের জেনারেল ম্যানজার (ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসেস) রওনকুল ইসলাম বলেন, আপনারাও দেখেছেন যে কক্ষটিতে বিস্ফোরণ ঘটেছে, সেখানে কোনো ভ্যান্টিলেশন নেই। আলো বাতাস চলাচলে সুযোগ নেই। দীর্ঘ সময় কক্ষটি বন্ধ থাকায় জমে থাকা গ্যাস থেকে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। তাছাড়া ভবন মালিক খপছুর আলমের অনিয়ম আমরা দেখতে পেয়েছি। গ্যাস সঞ্চালন লাইনের রাইজারগুলো (গ্যাসের রেগুলেটর) কোনো অবস্থাতেই কলোনির ভেতরে রাখার সুযোগ নেই। গ্যাসের রাইজার খোলা জায়গায় রাখতে হয়। কিন্তু দুর্ঘটনাকবলিত কক্ষের পাশেই দু’টি রাইজার রয়েছে। এগুলো তিনি ভবনের সংস্কার কাজ করার সময় সরিয়েছেন। এটি একটি অনিয়ম। তাছাড়া তার কলোনির এতগুলো বাসায় গ্যাস সংযোগ বৈধ কী না- সেটাও আমরা খতিয়ে দেখব।
 

মহানগর নিউজ/আরসি