বুধবার ১৯ জানুয়ারি ২০২২

| মাঘ ৬ ১৪২৮

মহানগর নিউজ :: Mohanagar News

প্রকাশের সময়:
০১:৫৫, ৬ ডিসেম্বর ২০২১

হিমু বড়ুয়া

চট্টগ্রাম কলেজে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্সে ‘গলার কাঁটা’ ভর্তি ফি!

প্রকাশের সময়: ০১:৫৫, ৬ ডিসেম্বর ২০২১

হিমু বড়ুয়া

চট্টগ্রাম কলেজে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্সে ‘গলার কাঁটা’ ভর্তি ফি!

ফাইল ছবি

চট্টগ্রাম কলেজের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে মাস্টার্স শেষ বর্ষের ভর্তি ফি'তে অকার্যকর খাতে টাকা নেওয়ার অভিযোগে উঠেছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কলেজের সরকারি ও বেসরকারি খাত থেকে যেসব ফি নেওয়া হচ্ছে তার অধিকাংশই অকার্যকর। এমনকি নগরের অন্য কলেজের তুলনায়ও বেশি। করোনার কারণে দীর্ঘদিন কলেজ বন্ধের পর এসব ফি মানতে নারাজ শিক্ষার্থীরা। তবে শিক্ষার্থীদের এসব অভিযোগকে অসত্য ও অযৌক্তিক বলে দাবি কলেজ কর্তৃপক্ষের। মন্ত্রণালয় ও কলেজের একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এসব খাতে ফি নেওয়া হচ্ছে দাবি কলেজ অধ্যক্ষের। 

শুক্রবার (৩ ডিসেম্বর) চট্টগ্রাম কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মোহাম্মদ মুজিবুল হক চৌধুরী সাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএ শেষ বর্ষের ভর্তিতে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মোট ৩৩টি খাতে ফি ধার্য করা হয়েছে। 

চট্টগ্রাম কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকসহ ১৭টি বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ও ১৯টি বিষয়ে স্নাতকোত্তর স্তরে পড়ানো হয়। এসব শ্রেণিতে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ২১ হাজার। প্রতি বছর মাস্টার্স কোর্সে গড়ে প্রতি বিভাগে ২০০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। সে হিসেবে ১৯টি বিভাগে  ৩ হাজার ৮০০ জন। একইভাবে স্নাতকেও মোট শিক্ষার্থী প্রায় ১৮ হাজার।  

সম্প্রতি দেওয়া মোট ৩৩টি খাত মিলিয়ে এমএ, এমএসএস মোট ফি ধার্য করা হয়েছে ৪ হাজার ১৭৫ টাকা। আর এমএসসি'তে ৪ হাজার ২৯৫ টাকা। যা অন্যান্য সরকারি কলেজের তুলনায় দুই থেকে তিনশ টাকা বেশি। ৩৩টি খাতের মধ্যে  ১৭, ২১, ২৭, ৩২ ও ৩৩ নম্বর খাত নিয়েই দেখা গেছে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ বেশি। 

সূত্রে জানা যায়, বেসরকারি খাতগুলোর মধ্যে মাস্টার্সের আইডি কার্ডের জন্য নেওয়া হচ্ছে ৩০ টাকা, ম্যাগাজিনের জন্য ৩০ টাকা, সেমিনার ফি ৪০০ টাকা, ব্যবস্থাপনা ফি ৫০ টাকা, ছাত্র সংসদ ফি ২৫ টাকা, মাস্টার্সের ব্যাজ ফি ২০ টাকা এবং আইসিটি ফি ২০ টাকা। আবার বিবিধ ফি ১০০ টাকা এবং নৈশ প্রহরী, অত্যাবশ্যকীয় কর্মচারী ব্যয়ে ফি ধরা হয়েছে ৮০০ টাকা।

এদিকে এই ভর্তি ফি‘র বিভিন্ন খাত নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা প্রশ্ন ও ক্ষোভ ঝেড়েছেন চট্টগ্রাম কলেজের বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থীরা।  

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কলেজের অর্থনীতি বিভাগের স্নাতকোত্তর শ্রেণির ছাত্র এমদাদ উদ্দিন মিরান মহানগর নিউজকে বলেন, ‌‌আমাদের চট্টগ্রাম কলেজ সরকারি। কিন্তু এখানে নৈশ প্রহরী ও কর্মচারীদের জন্য স্নাতকের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৪০০ টাকা ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের থেকে ৮০০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু হল গত ৭ বছর ধরে বন্ধ। কলেজে যে ব্যাজের কথা বলছে সেটা আমরা কারো গায়ে দেখিনা। আবার এতো খাতে ব্যয় ধরার পরও ব্যবস্থাপনা ফি ও বিবিধ ফি নেওয়া হচ্ছে কেন? এতো লাখ লাখ টাকা কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে সেটা আমরা জানি না।’     

একই প্রশ্ন মাস্টার্সের ছাত্র তারেক আজিজের। তিনি মহানগর নিউজকে বলেন, অনার্স ও মাস্টার্সে আইডি দেওয়ার কথা। কিন্তু  আইডি কার্ড ছাড়াই আমরা মাস্টার্স শেষ করে ফেললাম। অথচ এসবের টাকাও দিয়েছিলাম। কলেজের হল বন্ধ ২০১৫ সাল থেকে। সেখানেও ব্যয় ধরা হয়েছে। যে খাতগুলোর ব্যয় দেখানো হয়েছে সেগুলো প্রায়ই অকার্যকর। আমরা কলেজ প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি আসাদুজ্জামান বলেন, প্রায় প্রতিবছর শিক্ষার্থীরা এই বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে ধরনা দিলেও কর্তৃপক্ষ তাদের সিদ্ধান্তে বহাল রয়েছে। আমরা চাই এই বিষয়গুলো পুনরায় বিবেচনা করে নোটিশ প্রদান করুক।

চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সুবাস মল্লিক সবুজ মহানগর নিউজকে বলেন, আমাদের কলেজের বেসরকারি কর্মচারীদের ব্যয় নির্বাহ করতে হয় শিক্ষার্থীদের দেওয়া ফি দিয়ে। আমরা এ বিষয়ে কথা বলে জেনেছি, করোনার কারণে কলেজ আর্থিক ভাবে দুর্বল। আমি যেহেতু ছাত্র নেতা, তাই আমি অবশ্যই শিক্ষার্থীদের পক্ষে থাকব। তবে আমাদের বাস্তবতা মানতে হবে। একজন ছাত্রের আর্থিক সমস্যা যেমন বাস্তব সত্য, তেমনি কলেজের আর্থিক অবস্থার দিকেও আমাদের দেখতে হবে। তবে যে ফি নির্ধারণ করা হয়েছে তার থেকে ৫০০ টাকা ছাড় বা মওকুফ করলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য উপকার হবে।

কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. মুজিবুল হক চৌধুরী মহানগর নিউজকে বলেন, কোন অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার এখতিয়ার আমাদের নেই। এখানে আমরা ইচ্ছে করেই কোনো খাত থেকে টাকা নিতে পারি না। মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ একাডেমিক কাউন্সিলের নির্ধারিত খাত থেকে ফিগুলো নেওয়া হচ্ছে। এখানে আমার কিছু করার নেই।’

তিনি আরও বলেন, নিরাপত্তা ও নৈশ প্রহরী এবং অত্যাবশকীয় কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার জন্য ছাত্রদের থেকে টাকা নেওয়া হয়। এটা নির্ধারণ করতে পারেন একাডেমিক কাউন্সিল। এটা অত্যাবশকীয় কর্মচারী তহবিলে রাখা হয়। সরকার থেকে এ খাতে কোন টাকা পাওয়া যায় না। কলেজের নিয়োগ কমিটি থেকে কোন কর্মচারী নিয়োগ নিলে তার বেতন দিতে হয় শিক্ষার্থীদের থেকে। একাডেমিক কাউন্সিল থেকেই নির্ধারণ করা হয়েছে ৮০০ টাকা ফি।

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী এ বিদ্যাপীঠে সর্বশেষ ছাত্র নির্বাচন হয়েছিল ১৯৮১ সালে। সেই সময়ে শফিউল আজম ভিপি ও এস এম আবু তৈয়ব জিএস নির্বাচিত হন। ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত ছাত্র সংসদের দায়িত্ব পালন করেন তারা। এরপর পাল্টে যেতে থাকে দৃশ্যপট। কলেজে ঘাঁটি গাড়তে শুরু করে ছাত্রশিবির। পরে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে শিবিরকে হটিয়ে ক্যাম্পাস আবার দখল করে ছাত্রলীগ। 

ছাত্র সংসদের নামে ফি নেওয়ার প্রশ্নে অধ্যক্ষ বলেন, চট্টগ্রামের অনেক বড় বড় কলেজে এই খাতে টাকা নেওয়া হয়। আমাদের এখানে ছাত্র সংসদের যে ২৫ টাকা ফি সেটা কোন ব্যয় করা হয়নি। সে টাকা ছাত্র সংসদের তহবিলে জমা আছে। যখনই ছাত্র সংসদ বসবে তখনই এই তহবিল থেকে টাকা তোলা যাবে।

ছাত্র সংসদের নির্বাচন নিয়ে তিনি বলেন, উর্ধ্বতন পক্ষ থেকে নির্বাচনের আদেশ আসলে আমরা এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে পারব। এখানে কলেজের পরিবেশ নিয়েও ভাববার বিষয় রয়েছে।

কলেজের বার্ষিক প্রকাশনা ‘অন্বেষা’ প্রত্যেক শিক্ষার্থী পায় বলে দাবি করে  অধ্যক্ষ অধ্যাপক প্রফেসর মোহাম্মদ মুজিবুল হক চৌধুরী বলেন, এটা এমন ভাবে ছাপানো হয়, যেন প্রত্যেক শিক্ষার্থী পায়। যারা বলেছে তারা ভুল বলেছে।

তিনি বলেন, ‘উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের ব্যাজ ফি নেওয়ার বিষয়টি মন্ত্রণালয় থেকে নির্ধারিত রয়েছে। শিক্ষার্থীরা করোনার কারণে অনেকে ক্ষেত্রে ব্যাজ পেতে বিলম্ব হয়েছে। কলেজও দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। তবে সবাই তাদের ব্যাজগুলো পেয়ে যাবে। এই খাতে টাকা এদিক সেদিক হওয়ার কোন সুযোগ নেই। তবে অনার্স ও মার্স্টাসে শিক্ষার্থীদের পরিচয় পত্র ও ব্যাজ না পাওয়ায় বিষয়ে তিনি কি উচ্চ মাধ্যমিক নিয়েই কথা বলেন। 

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‌ছাত্ররা ছোট, অনেক কিছুই বুঝে না। আমাকে যখন বলেছে বাড়তি, আমি তাদের বলেছি আগে স্টাডি করে আস। আমি এখানে ডিসিশন মেকার না। আমার এখানে কমিটি রয়েছে। এ কমিটি আমার চেয়ে ক্ষমতাধর। এখানে ভুল করার কোন সুযোগ নেই। একটা টাকা বেশি নেওয়ার অধিকার আমার নেই। আমার কমিটিরও নেই। তারা এসব দেখশোনা করেন। আমার কাছে কয়েকজন এসে অভিযোগ করেছিল এসব বিষয়ে। তারা বিভিন্ন কলেজের ফি’র সাথে তুলনা দেখিয়েছে। আমরা পরিপত্রের বাইরে কোন খাতে অতিরিক্ত ফি নিচ্ছি না।

মহানগর নিউজ/এইচবি/এআই