বৃহস্পতিবার ০২ ডিসেম্বর ২০২১

| অগ্রাহায়ণ ১৮ ১৪২৮

মহানগর নিউজ :: Mohanagar News

প্রকাশের সময়:
০৯:২৯, ২৮ জুন ২০২১

ফারুক মুনির

বিপন্ন হালদা, দায়ী মানুষই

প্রকাশের সময়: ০৯:২৯, ২৮ জুন ২০২১

ফারুক মুনির

বিপন্ন হালদা, দায়ী মানুষই

সঙ্কটে হালদা

খাগড়াছড়ি জেলার রামগড় উপজেলার পাতাছড়া এলাকার দুর্গম পাহাড়ি ছড়া হচ্ছে হালদা নদীর উৎস। এর সঙ্গে বেলছড়ি ও মানিকছড়ির সালদাছড়া যুক্ত হয়ে হালদা খালে রূপ নিয়েছে। হালদা খাল মানিকছড়ি হয়ে  ফটিকছড়ির ধুরুং খালে মিলিত হয়ে হালদা নদীতে পরিণত হয়েছে। এরপর ফটিকছড়ি, রাউজান, হাটহাজারী উপজেলা হয়ে নগরের চান্দগাঁও থানা ছুঁয়ে কর্ণফুলী নদীতে পতিত হয়েছে।

১২৩ কিলোমিটার দীর্ঘ হালদা নদীর রহস্য বা অনন্য চরিত্র হলো তার অক্সবো (অশ্বক্ষুরাকৃতি) বাঁক। ওই বাঁকগুলোই হালদাকে অন্য নদী থেকে আলাদা করেছে। কিন্তু ১১টি বাঁক কেটে এই নদীর ২৫.২৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য কমিয়ে ফেলা হয়। ফলে কমেছে পানি ধারণ ক্ষমতা। আবার প্রাকৃতিক আকৃতি নষ্ট হওয়ায় এর নেতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান হচ্ছে। হালদায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় নদীর নিজস্ব মাছ বিলুপ্ত হওয়ার পথে। 

১৯০৫ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত মোট ১০ বারে ২৫.২৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ছোট করা হয় হালদার। ১৯০৫ থেকে ১৯১০ সালের মধ্যে রাউজান উপজেলার পশ্চিম গুজরা গ্রামের মগদাইর খালের মুখে ছৈয়দ্দার চর অক্সবো বাঁক কেটে দেওয়া হয়। যার দৈর্ঘ্য ছিল ১.৮০ কিলোমিটার। এর দেড় যুগ পর ১৯২৮ সালে হাটহাজারী উপজেলার মাছুয়াঘোনা অক্সবো বাঁক কাটা হয়েছে। ২.৫০ কিলোমিটারের ওই বাঁক ছিল রাউজানের পূর্ব গুজরা গ্রামের অংশ। 

Halda-3

১৯৪৮ সালে তিনটি বাঁক কাটা হয়েছিল । হাটহাজারী উপজেলার ছিপাতলী গ্রামের ২ কিলোমিটার অক্সবো বাঁকটি কেটে দেওয়া হয়। ওই বাঁক ছিল রাউজানের গহিরা গ্রামের অংশ। একই উপজেলার ৮.৩০ কিলোমিটারে বাড়িঘোনা অক্সবো বাঁক কাটা হয়। ফটিকছড়ি উপজেলার আবদুল্লাহপুর গ্রামের ১.১০ কিলোমিটারের অক্সবো বাঁক কাটা হয়েছিল। এটি ছিল হাটহাজারীর নাঙ্গলমোড়া গ্রামের অংশ।

এরপর একযুগ বিরতি দিয়ে ১৯৬১ সালে ফটিকছড়ি উপজেলার ভূজপুর গ্রামের ০.৮০ কিলোমিটারের অক্সবো বাঁক কেটে দেওয়া হয়। ১৯৬৪ সালে দুই কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের হাটহাজারী উপজেলার অঙ্কুরীঘোনা অক্সবো বাঁক কাটা হয়। যা রাউজানের গহিরা গ্রামের অংশ। 

স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে ফটিকছড়ি উপজেলার হারুয়ালছড়ির ১.৭৫ কিলোমিটার ও সুন্দরপুর গ্রামের এক কিলোমিটারের অক্সবো বাঁক কেটে দেওয়া হয়। ১৯৮৮ সালে কাটা হয় দুই কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের রাউজান উপজেলার সোনাইরচর অক্সবো বাঁক, যা হাটহাজারীর গড়দুয়ারা গ্রামের অংশ। এরপর ২০০২ সালে কাগতিয়ার চর অক্সবো বাঁক কাটা হয়। দুই কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ওই বাঁক ছিলা হাটহাজারীর গড়দুয়ারা গ্রামের অংশ।

আশির দশক থেকে হালদা নিয়ে গবেষণা করছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী আজাদী। তিনি মহানগর নিউজকে বলেন, 'হালদা হচ্ছে অনন্য বৈশিষ্ট্যের নদী। এখানে রয়েছে নানা প্রজাতির মাছ। বাঁক কেটে নদীর দূরত্ব কমানো, রাবার ড্যাম এবং স্লুইস  গেট নির্মাণ, কলকারখানা এবং গৃহস্থালী বর্জ্যের কারণে জীববৈচিত্র্য পরিবর্তন আসছে। এসব কারণে আগের মতো মাছের ডিম মিলছে না। হালদার হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে অকেজো স্লুইস গেট অপসারণ এবং পানির প্রবাহ যেন না কমে সে দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

Sluice-Gate

হালদা রক্ষায় সরকারে কঠোর অবস্থানের কারণে হাটহাজারীর পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্ট ও এশিয়ান পেপার মিল বন্ধ রয়েছে। এই দুটি প্রতিষ্ঠান তাদের কারখানার বর্জ্য পরিশোধিত না করে সরাসরি খালে ফেলতো। খাল হয়ে কারখানার বর্জ্য হালদায় পতিত হতো। তাই কারখানা চালু করতে হলে ইটিপি স্থাপনসহ বেশ কিছু শর্ত দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। 

অপর দিকে হালদার সংযুক্ত খালগুলোর দুপাড়ের বাসিন্দারা তাদের গৃহস্থালী বর্জ্য নিয়মিত খালে ফেলে। খাল হয়ে তা গিয়ে পৌঁছে হালদায়। বিস্তৃর্ণ এলাকায় চাষ হতো তামাক। প্রশাসনের নিয়মিত তদারকিতে হালদাপাড়ের বাসিন্দাদের মাঝেও সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। গৃহস্থালীর বর্জ্য আগে থেকে কমেছে এবং তামাক চাষ একেবারেই বন্ধ হয়েছে বলে জানান হালদা রক্ষা কমিটির সদস্য আমিন মুন্না।

তবে হালদা পাড়ে প্রচুর ইটভাটা তৈরি করা হয়েছে। রাউজান, ফটিকছড়ি ও ভূজপুর এলাকায় পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া এসব ইটভাটা প্রশাসন উচ্ছেদ করেনি। হাটহাজারী অংশে অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদ হয়েছে। এসব ইটভাটার বর্জ্য হালদার পানিকে দূষিত করছে।

অক্সবো বাঁক কাটার পর হালদার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করার আয়োজন করা হয়েছে ২০১২ সালে রাবার ড্যাম স্থাপন করে। ভূজপুরের আমতলী এলাকায় সাড়ে চার মিটার উচ্চতার রাবার ড্যামটির বড় সুবিধাভোগী হচ্ছে চা বাগানের মালিকরা। নদীর ওপর ও নদীর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হারুয়ালছড়ি খালে দু’টি রাবার ড্যাম বসানোর কারণে চা বাগান ও বোরো চাষের জমিতে পানির জোগান হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সঙ্কটে পড়েছে হালদা।

Rubber-Dam

সরেজমিনে আমতলী এলাকায় গিয়ে স্থানীয় কৃষক রণজিৎ বড়ুয়ার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ধান চাষের কথা বলা হলেও মূলত চা বাগানের জন্য এই রাবার ড্যাম। কারণ ওই অঞ্চলের আড়াই হাজার হেক্টর জমিতে ধান চাষের জন্য রাবার ড্যাম স্থাপন করা হলেও মাত্র ১২শ থেকে দেড় হাজার হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়। রাবার ড্যাম স্থাপনের আগে ৬০০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হতো। তাহলে মাত্র ৬০০ হেক্টরের জন্য এই রাবার ড্যামের যৌক্তিকতা নেই। কারণ নদীতে চার মাসের বেশি সময় এই রাবার ড্যামের কারণে পানি থাকে না।

আবুল হাশেমের নামে আরেক কৃষক বলেন, চাষাবাদের পাশাপাশি আমি ছোটকাল থেকেই নদীতে মাছ ধরি। আগে ঘণ্টা খানেক জাল ফেললে যে মাছ পেতাম এখন সারা দিনেও তা মিলে না। রাবার ড্যামের কারণে নদী শুকিয়ে যায়।

রাবার ড্যাম নিয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির সমন্বয়কারী ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া বলেন, ‘ভূজপুর এলাকায় হালদার উজানে রাবার ড্যামের কারণে প্রায় ২০ ভাগ পানি প্রত্যাহার হয়েছে। ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত উজান এলাকার ২০ কিলোমিটার নদী শুকিয়ে যায়। পানি প্রবাহ না থাকায় মাছের প্রধান খাদ্য প্ল্যাঙ্কটন ও বেনথাস শূন্যের কোটায় ঠেকে। ডিম ছাড়ার আগের ওই সময়টাতে মাছের খাদ্য সঙ্কট তৈরি হয়।’

তিনি আরও বলেন, আট সদস্যের যৌথ সমীক্ষায় এই রাবার ড্যামের পাশাপাশি হালদার সংযোগ খাল হারুয়ালছড়ি থেকে রাবার ড্যাম সরানোর সুপারিশ করা হয়েছিল। ওই এলাকায় পানি কম প্রয়োজন হয় এমন সবজি চাষ, অপরিকল্পিত স্লুইজগেট সংস্কার করে পানি প্রবাহের নিশ্চিত করার সুপারিশ ছিল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য এখনও সেই সুপারিশ অন্ধকারে রয়ে গেছে। 

মানব সৃষ্ট এসব কারণে হালদায় মাছের ডিম দেওয়ার পরিমাণ কমেছে। যেখানে ১৯৪৫ সালে ৫ হাজার কেজি পোনা উৎপাদন হয়েছিল সেখানে ২০২১ সালে এসে ১০০ থেকে ১২১ কেজি পোনা উৎপাদন সম্ভব হয়েছে। অথচ গত দুই দশকের মধ্যে এ বছরে মা মাছ নিধন, ইঞ্জিন চালিত নৌকা নিয়ন্ত্রণ করে হালদার পরিবেশ সংরক্ষণ করা হয়েছিল। 

এই বিপর্যয়ের কারণ জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া বলেন, এবার ডিম ছাড়ার মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হয়নি। কাপ্তাই লেকে পানি না থাকা টারবাইনগুলো সচল ছিল না। ফলে কর্ণফুলীর পানিতে লবণাক্ততা ছিল মাত্রাতিরিক্ত। একই সময়ে সাগরে ঘূর্ণিঝড় থাকায় জোয়ারের পানির সাথে অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি প্রবেশ করেছে হালদায়। কারণ কর্ণফুলীর নাব্যতা সঙ্কটের কারণে পানির ধারণ ক্ষমতা কমেছে। তার প্রভাব সরাসরি হালদায় এসে পড়ছে। হালদাকে বাঁচাতে হলে হালদা নিয়ে যেসব সুপারিশ বিশেষজ্ঞ কমিটি করেছে, তা বাস্তবায়নের পাশাপাশি কর্ণফুলীকেও বাঁচানোর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান এই বিশেষজ্ঞ।

আরও জানতে পড়ুন :

হালদা হারিয়েছে ৬১ প্রজাতির মাছ, দায়ী ১০ কারণ

হালদার মৃত্যুঘণ্টা বাজাবে কর্ণফুলী !

হালদায় প্রত্যাশিত ডিম না পাওয়ার দুই কারণ

মহানগর নিউজ/কেডি