বৃহস্পতিবার ০২ ডিসেম্বর ২০২১

| অগ্রাহায়ণ ১৮ ১৪২৮

মহানগর নিউজ :: Mohanagar News

প্রকাশের সময়:
১৫:৪০, ২৬ জুন ২০২১

ফারুক মুনির

হালদা হারিয়েছে ৬১ প্রজাতির মাছ, দায়ী ১০ কারণ

প্রকাশের সময়: ১৫:৪০, ২৬ জুন ২০২১

ফারুক মুনির

হালদা হারিয়েছে ৬১ প্রজাতির মাছ, দায়ী ১০ কারণ

হালদা হারিয়েছে ৬১ প্রজাতির মাছ

এশিয়ায় কার্প জাতীয় মাছের প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র হালদা নদী। একসময় এ নদী ছিল জীববৈচিত্র্যে ভরপুর। কিন্তু প্রাণঘাতী বিভিন্ন প্রকল্প, বাঁক কেটে নদীর গতিপথ পরিবর্তন, দূষণসহ নানা কারণে এখন চরম সংকটে হালদা। গত ৪২ বছরে বিরূপ পরিবেশের কারণে এ নদী থেকে হারিয়ে গেছে চিতল, ভেদা, আইর (গুইজ্জা), ঘোর পুঁইয়াসহ প্রায় ৬১ প্রজাতির মাছ। এরমধ্যে ৪৩টি প্রজাতি হারিয়েছে গত এক দশকে।

১৯৭৮ সালে মার্কিন মৎস্যবিজ্ঞানী ডব্লিউ জে রেইনবোথ ও তার দল হালদা নিয়ে গবেষণায় ৯৯ প্রজাতির মাছ ও ১২ প্রজাতির চিংড়ি জাতীয় মাছ তালিকাভুক্ত করেছিলেন। রেইনবোথের সাথে সেই গবেষণাদলের অন্যতম সদস্য ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. আলী আজাদী। ড. আজাদী তখন তার স্নাতকোত্তর শ্রেণির ৩৩২ পৃষ্ঠার থিসিস পেপার প্রস্তুত করেছিলেন হালদা বিষয়ে। যা তিনি ১৯৭৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা দেন। আর সেটিই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশে হালদা নিয়ে প্রথম কোনো একাডেমিক গবেষণা। সেই থেকে আজ অবধি ড. আজাদী জড়িয়ে আছেন হালদার সাথে।

হালদার জীববৈচিত্র্য নিয়ে ড. আজাদী বলেন, ২০০৪ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত একটানা গবেষণায় হালদায় ৮৩ প্রজাতির মাছ ও ১০ প্রজাতির চিংড়ি জাতীয় মাছ পাওয়া যায়। হালদায় নিজস্ব মাছের পাশাপাশি রয়েছে সামুদ্রিক মাছ, মোহনার মাছ, পুকুরের মাছ, প্লাবন ভূমির মাছ ও বিলের মাছ।

অধ্যাপক ড. আলী আজাদী ও অধ্যাপক আরশাদ আলীর গবেষণায় যেসব মাছের উল্লেখ ছিল সেগুলো হলো কাঁচকি, চাপিলা, ইলিশ, ফাইস্যা, ফলি, বাটা, কালিবাউশ, সাদা ঘইন্যা, রুই, কাতল, মৃগেল, বিগহেড, সিলভার কার্প, মলা, চেলা, কালা বাটা/সজনি, নাক-কাটা, জাতি পুঁটি, তিত পুঁটি, গেলি পুঁটি, কাঞ্চন পুঁটি, দার্কিনা, বাচকুইট্যা, গুতুম, বড় বাইন,

Halda-4

কুচিয়া, বাইন, নল বাইন, আঁইর, গুলশা, নুনা ট্যাংরা, ট্যাংরা, মাগুর, শিং, পাঙ্গাস, বাঁশপাতা, গারুয়া, মুরিবাচা, বাচা, তিনকাটা বাতাসি, পাবদা, বোয়াল, কাগজি গুরা, টুইট্যা, কাকিলা, চুক্কনি, কুমিরাখিল, চান্দা, লালচান্দা, চান্দা (হেবিট্যাট), বিশতারা, পোয়া, পোয়া-২, তেলাপিয়া, কৈ, শুন্দ্রা, বেলে, বেলেগুরা, ফুলচিংড়ি, দোরা চিংড়ি, সবুজ চিংড়ি, লাল চিউ,

halda-2-3

সাদা চিউ, বারগুনি, বারগুনি-২, ডকমাছ, কালিশা, ছোট কালিশা, থপশি, চ্যাং, টাকি, শোল, ব্যাঙ মাছ,  বাটা (হলুদ), বাটা-২, ছোট বেলে, কাটা বাইন, গুচি বাইন, তারা বাইন, কুকুর জিহ্বা, কুকুর জিহ্বা-২।

Shrimp-1

৮৩ প্রজাতির মাছের সাথে ছিল নয় প্রজাতির চিংড়ি। এগুলো হলো ডিমুইয়া ইছা, গলদা চিংড়ি, চটকা চিংড়ি, পাইট্যা ইছা, লইট্যা চিংড়ি, হরিণা চিংড়িসহ ৯ প্রজাতির চিংড়ি ও চিমটা কাঁকড়া।

হালদা নিয়ে সর্বশেষ বড় আকারের সমীক্ষা পরিচালিত হয় ২০১৬ সালে। বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে এ সমীক্ষা চালায়। পানিসম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ইমেরিটাস ড. আইনুন নিশাতের নেতৃত্বে ওই সমীক্ষায় অন্যতম বিশেষজ্ঞ সদস্য ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া।

সেই সমীক্ষার প্রসঙ্গ ধরে হালদা গবেষক ড. কিবরিয়া জানালেন, এ নদী নিয়ে সর্বশেষ গবেষণায় সবমিলিয়ে মাত্র ৫০ প্রজাতির মাছের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। একটা সময় হালদা পাড়ের বাঁশঝাড়ের নিচে জাল ফেললেই মিলত চিতল। সেই চিতল, ভেদা, গুইজ্জা আইর, ঘোর পুঁইয়াসহ অনেক প্রজাতির মাছ হালদায় পাওয়া যাচ্ছে না।

halda-eng_3

সর্বশেষ সমীক্ষায় মেলা মাছ হলো কাঁচকি, চাপিলা, ফাইস্যা, মলা, কাতলা, মৃগেল, রুই, কালিবাউশ, ঘনিয়া, গ্রাসকার্প, কমন কার্প, সিলভার কার্প, বাঘাবাটা, গুতাম, দারকিনা, দারকিনা-২, প্রেমচালা, জায়া, তিতপুঁটি, গিলিপুঁটি, জাতপুঁটি,

halda-eng_4

পাবদা, বোয়াল, গুলিয়া ট্যাংরা, গুলশা ট্যাংরা, বাজারি ট্যাংরা, আঁইর, কাজুলি, বাচা, শিং, মাগুর, টাকি, শোল, চ্যাঙ, পোয়া, বাইন, গুচিচাইন, নামা চান্দা, কাটা চান্দা, চিরিং, বেলে, ডহুকমাছ, চেউয়া, চেউয়া-২, কুকুর জিভ, কুচিয়া, কুচিয়া-২ (রাতা), কৈ, খলিশা ও কাকিলা।

halda-eng_5

আশঙ্কাজনক হারে হালদায় মাছের এসব প্রজাতির হারিয়ে যাওয়ার পেছনে গবেষকরা বলছেন, নির্বিচারে মাছ শিকার, উজানে রাবার ড্যাম, সংযোগ খালে কনক্রিট ড্যাম স্থাপন, বিভিন্ন খালের মুখে স্লুইচগেট দিয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বিঘ্নিত করা, পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, দূষণ, বালি উত্তোলন, নদীর পাড়ে ইটভাটা স্থাপন, বিষ প্রয়োগ, বিভিন্ন সময়ে নদীর বাঁক কেটে নদী সোজা করার মতো অন্তত ১০টি মূল কারণ দায়ী। এছাড়া নদীর পাড় ভাঙনরোধে ব্লক স্থাপন করতে গিয়ে নদীতে জিও ব্যাগ ও কনক্রিটের ব্লক ফেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মাছের স্বাভাবিক আবাসস্থল ও কুমগুলো।

জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের প্রভাব পড়েছে হালদায় রুই জাতীয় মাছের ডিম ছাড়ার ওপর। যেখানে ১৯৪৫ সালে ৫ হাজার কেজি পোনা উৎপাদন হয়েছিল, সেখানে ২০২১ সালে এসে তা ঠেকেছে ১০০ থেকে ১২১ কেজিতে। একটা সময় হালদার পোনা ভারত, মিয়ানমারে রপ্তানি করা হতো। হালদার সেই পোনা থেকে চাষ করা মাছ মিয়ানমার এখন বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে।

২০১৬ সালের সমীক্ষার পর সরকার হালদা রক্ষায় কঠোর হয়। স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর হালদাকে দূষণমুক্ত রাখতে নানা উদ্যোগ নেয়। এরই অংশ হিসেবে এশিয়ান পেপার মিল ও পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই দু’টি প্রতিষ্ঠান তাদের কারখানার বর্জ্য পরিশোধন ছাড়াই হালদায় ফেলত। 

অপরদিকে মা মাছের জীবন নিরাপদ করতে হালদাকে প্রথমে অভয়ারণ্য ও পরে বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ ঘোষণা দেয় সরকার। সরকারের পাশাপাশি একাধিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাও কাজ করছে। সরকার হালদা রক্ষায় প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবকে প্রধান করে আরও ৭ জন সচিবসহ ১৯ জনের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটিও গঠন করেছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, ২০১৬ সালের সমীক্ষা শেষে করা সুপারিশ ও সরকার গৃহীত পদক্ষেপ বাস্তবায়ন হলে আবার সুদিন ফিরবে হালদার।


আরও জানতে পড়ুন:
হালদার মৃত্যুঘণ্টা বাজাবে কর্ণফুলী !
হালদায় প্রত্যাশিত ডিম না পাওয়ার দুই কারণ

মহানগর নিউজ/আরসি