বৃহস্পতিবার ০২ ডিসেম্বর ২০২১

| অগ্রাহায়ণ ১৮ ১৪২৮

মহানগর নিউজ :: Mohanagar News

প্রকাশের সময়:
১৬:২২, ২৯ মে ২০২১

ফারুক মুনির

হালদার মৃত্যুঘণ্টা বাজাবে কর্ণফুলী !

প্রকাশের সময়: ১৬:২২, ২৯ মে ২০২১

ফারুক মুনির

হালদার মৃত্যুঘণ্টা বাজাবে কর্ণফুলী !

‘মৃতপ্রায়’ কর্ণফুলী নিজের সক্ষমতা হারিয়ে হালদাকে গিলে খাওয়ার উপক্রম হয়েছে

এশিয়ায় কার্প জাতীয় মাছের একমাত্র প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র হালদা। এ হালদা মিলেছে কর্ণফুলী নদীতে। এখন ‘মৃতপ্রায়’ কর্ণফুলী নিজের সক্ষমতা হারিয়ে হালদাকে গিলে খাওয়ার উপক্রম হয়েছে। অথচ এ নদীকে দূষণমুক্ত রাখতে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা সারা বছর কর্মব্যস্ত থাকে।

এ বছর পূর্ণিমা তিথিতে দুই দফা নমুনা ডিম ছাড়লেও মা মাছ প্রত্যাশিত পরিমাণ ডিম ছাড়েনি। আগামী জো-তে যদি ডিম না ছাড়ে তবে দেশের আমিষের চাহিদা পূরণে ঘাটতি দেখা দেবে। ডিম না ছাড়ার জন্য বিশেষজ্ঞরা দুটি বিষয়কে প্রধানত দায়ী করছেন। একটি মানুষের সৃষ্টি সংকট অপরটি প্রাকৃতিক বৈরিতা।

মানুষের সৃষ্ট সংকট হলো, কর্ণফুলীর নাব্যতা হারানো। এর তলদেশে প্রায় ২৫ ফুট পলিথিনের স্তর জমেছে। আবার অবৈধ দখলের কারণে নদীর দুপাশ সংকুচিত হয়েছে। ফলে পানির ধারণ ক্ষমতা কমেছে। যার কারণে নিয়মিত জোয়ারের পানি সাগর থেকে কর্ণফুলী হয়ে হালদায় প্রবেশ করে। এতে মিঠা পানির নদী হালদা তার মূল চরিত্র হারাতে বসেছে।

কর্ণফুলী তার নাব্যতা, যৌবন হারানোয় এবার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হালদা। ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে সাগরে পানির উচ্চতা বেড়েছে প্রায় ছয় ফুট। কর্ণফুলীর পানি ধারণ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় সেই পানি ঢুকেছে হালদায়। হালদার দুপাশ উপছে নষ্ট হয়েছে ক্ষেত-খামারও। 

কর্ণফুলীর দূষণ সম্পর্কে জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. ইদ্রিস আলী মহানগর নিউজকে বলেন, নদীর দুপাড় দখল করে ইটিপি ছাড়া কারখানা স্থাপনের ফলে বর্জ্য সরাসরি কর্ণফুলীতে পড়ে। কমেছে কর্ণফুলী  প্রশস্ততাও। আবার নগরবাসীর ব্যবহৃত পলিথিন-প্লাস্টিকের স্তর জমেছে প্রায় ২৫ ফুট। পাহাড় কাটার মাটি বৃষ্টির সঙ্গে কর্ণফুলীতে পড়ছে। ফলে ভরাট হওয়ার কারণে নদী তার স্বাভাবিক পানির ধারণ ক্ষমতা হারিয়েছে। 

চট্টগ্রাম ওয়াসা হালদার পানি পরিশোধন করে নগরে সরবরাহ করে। হালদার পানিতে রেকর্ড পরিমাণ লবণাক্ততা বাড়ায় ওয়াসার পানি উৎপাদনও বিঘ্নিত হয়। জানতে চাইলে ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাদেক উদ্দিন চৌধুরী জানান, স্বাভাবিক অবস্থায় হালদার পানিতে লবণাক্ততা থাকে ২৫ মিলিগ্রাম পার লিটার। সেই জায়গায় ২৬ মে (বুধবার) ছিল ৩ হাজার ৬০০ মিলিগ্রাম পার লিটার, ২৭ মে (বৃহস্পতিবার) ছিল ৪ হাজার মিলিগ্রাম পার লিটার।

লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়া এবং প্রত্যাশিত পরিমাণ ডিম না ছাড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির কো-অর্ডিনেটর অধ্যাপক ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া বলেন, জোয়ারের পানি ঢুকে মিঠা পানির হালদার চিরায়ত বৈশিষ্ট্য নষ্ট করে দিয়েছে। যেখানে লবণাক্ততা থাকার কথা ১ পিপিটি, সেখানে আমরা পেয়েছি ৩৬ থেকে ৪০ পিপিটি। অপরদিকে পূর্ণিমা তিথিতে বৃষ্টি হয়নি। যার কারণে দুবার নমুনা ডিম ছেড়েও পর্যাপ্ত ডিম ছাড়তে পারেনি মা মাছ।

তিনি আরও বলেন, প্রাকৃতিক নিয়ম অনুযায়ী বজ্রসহ প্রচুর বৃষ্টিপাত হলে পাহাড়ি ঢল নেমে আসে হালদায়। মিঠা পানির নদী হালদায় তখন মাছের গোনাড (ডিম থাকার জায়গা) পরিপক্বতা পায়। আর মা মাছ তার ডিম ছেড়ে যায়। এবার বৃষ্টিপাত হয়নি, পাহাড়ি ঢলও নামেনি। প্রচুর মা মাছ আনাগোনা করলেও আমাদের হিসাবে সাড়ে ছয় হাজার কেজি ডিম পাওয়া গেছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর এপ্রিল ও মে মাসে সর্বমোট ২০৭ দশমিক ৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, তাও ১৩ দিনে। গত বছর ২০২০ সালে এই সময়ে ১৬ দিনে ১ হাজার ৩১৪ দশমিক ১ মিলিমিটার রেকর্ড হয়েছিল। আর ২০১৯ সালে ১৮ দিনে এই দুই মাসে বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছিল ৭৬১ দশমিক ৯ মিলিমিটার।

তবে হালদায় ডিম সংগ্রহের কম-বেশি হওয়া নতুন নয়। ২০০৬ সালে ৩২ হাজার কেজির বেশি সংগ্রহ করা হয়েছিল। আর ২০২০ সালে ২৫ হাজার ৫৩৬ কেজি। ২০১৯ সালে মাত্র সাত হাজার কেজি ডিম সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছিল। আবার ২০১৬ সালে তিনবারে সাতশ কেজি নমুনা ডিম ছেড়ে আর ডিমই ছাড়েনি মা মাছ। তবে সেসময় হালদায় তেমন নজরদারি ছিলো না। দূষণ ও মৎস্যশিকারীর উৎপাত ছিল বেশি।

বর্তমান সরকার হালদাকে বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ ঘোষণা করে হালদায় মাছ শিকার নিষিদ্ধ করেছে। হালদার নিরাপত্তায় নৌ পুলিশ উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন সিসি ক্যামেরা স্থাপন করেছে। হাটহাজারী ও রাউজান উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাকে উচ্চ আদালত সার্বক্ষণিক হালদা তদারকির আদেশও দিয়েছেন। 

হালদায় অতিমাত্রায় লবণাক্ত পানি প্রবেশ করায় ভাবিয়ে তুলছে বিশেষজ্ঞদের। হালদার মাছ অন্য যে কোনো অঞ্চলের মাছের তুলনায় দ্রুত বৃদ্ধি পায়, স্বাদেও অতুলনীয়। দেশের আমিষের চাহিদার বড় একটা অংশ মেটায় হালদার ডিম থেকে উৎপাদিত মাছ। হালদার মা মাছের নিরাপত্তায় কর্ণফুলীকেও তার আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনার বিকল্প দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। না হয় কর্ণফুলী নিজে মরার সাথে সাথে হালদায়ও বিপর্যয় ডেকে আনবে।

কেডি