বুধবার ১৯ জানুয়ারি ২০২২

| মাঘ ৬ ১৪২৮

মহানগর নিউজ :: Mohanagar News

প্রকাশের সময়:
২০:০৩, ২ জানুয়ারি ২০২২

মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন, বাঁশখালী 

কক্সবাজারের স্বাদ নিতে ঘুরে আসুন বাঁশখালী

প্রকাশের সময়: ২০:০৩, ২ জানুয়ারি ২০২২

মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন, বাঁশখালী 

কক্সবাজারের স্বাদ নিতে ঘুরে আসুন বাঁশখালী

বাঁশখালী সমুদ্র সৈকত

৩৯২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা একটি উপজেলা বাঁশখালী। পশ্চিমে নীল জলের বিস্তৃত সমুদ্র সৈকত, পূর্বে পাহাড়, অভয়ারণ্য, ইকোপার্ক সমৃদ্ধ সবুজে সৃজিত হয়েছে নন্দনকানন। প্রকৃতি ৩৯২ বর্গ কিলোমিটারের বাঁশখালীকে সাজিয়েছে আপন মনে। চা-বাগানে অবারিত সবুজের হাতছানি, প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট স্বচ্ছ জলের দীর্ঘ পাহাড়ি হ্রদে অজস্র পাখির বিচরণ, সমুদ্রের বেলাভূমিতে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখার মিশেল অনুভূতি, একই সাথে নিতে পারেন শুধু বাঁশখালীতেই!

বাঁশখালী ইকোপার্ক

বাঁশখালী ইকোপার্ক একটি পরিপূর্ণ ভ্রমণ কেন্দ্র। শীলকূপ ইউনিয়নে প্রায় এক হাজার হেক্টর বনভূমির সমন্বয়ে গঠিত এটি। এই পার্কে রয়েছে পর্যটকদের নজর কাড়ার মতো জীব-জন্তু, পাখি, বৃক্ষ, ঝুলন্ত সেতু, সুউচ্চ পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, ডানের ছড়া ও বামের ছড়া লেক। খুব বেশি আলোচিত হয়নি বলে অনেকেই জানেন না, বাংলাদেশের দীর্ঘতম ঝুলন্ত সেতুটি রাঙ্গামাটি নয়, এই ইকোপার্কেই। কাঠের পাটাতনে নির্মিত সেতুটির দৈর্ঘ্য ১২২মিটার বা ৪০০ ফুট। এই সেতুটি ৩০ জন মানুষের ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন। তাছাড়া এই পার্কে রয়েছে ৮৫ প্রজাতির পাখি, ৪৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ২৫ প্রজাতির সরীসৃপ, ৭ প্রজাতির উভচর প্রাণী। 

১৯৯৭ সালের জরীপ মতে, এই পার্কে আছে ৩১০ প্রজাতির উদ্ভিদ। যার মধ্যে ১৮ প্রজাতির দীর্ঘ বৃক্ষ, ১২ প্রজাতির মাঝারি বৃক্ষ, ১৬ প্রজাতির অর্কিড, ইপিফাইট ও ঘাস জাতীয় গাছ। তাছাড়া এই পার্কে প্যানারমিক ভিউ টাওয়ার রয়েছে। 

বোট রাইডিং, পিকনিক সেট, দ্বিতল রেস্ট হাউস, রিফ্রেশমেন্ট কর্ণার, সুউচ্চ অবলোকন টাওয়ার, প্যানারমিক ভিউ টাওয়ার, মিনি চিড়িয়াখানা, ভাসমান প্লাটফর্ম, সাসপেনশন ব্রীজ, মিনি জল বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র- কী নেই এখানে? একই সাথে প্রাকৃতিক সেগুন বাগান, জুম ক্ষেত আর বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি দেখে মুগ্ধ হতে পারেন ওভারভিউ টাওয়ারে দাঁড়িয়ে। প্রায় ৮কিলোমিটার দৈর্ঘের পাহাড়ি হ্রদ মোহনীয় আবেশ ছড়িয়ে দেয় পর্যটকের মনে।

নাপোড়া অর্গানিক ইকো ভিলেজ

বাঁশখালীর নাপোড়া গ্রামে অবস্থিত এই পার্কটি। এটিকে অনেকে ‘তারেক পার্ক’ নামে চেনে। বাঁশখালীকে বিশ্ব দরবারে পরিচিত করতে এই পার্কটি প্রতিষ্ঠা করেন দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা মরহুম মাষ্টার নজির আহমদের কনিষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান। 

প্রায় ১২ কানি জায়গা জুড়ে পার্ককে সুনিপুণ কারিগরদের মাধ্যমে সাজানো হয়েছে। আছে ময়ুর-ময়ুরী, উটপাখি ও বাজপাখিসহ নানা প্রজাতির পাখি। মাটি, কাঠ, বেত, রশি ও পরিত্যক্ত যানবাহনের টায়ার দিয়ে তৈরি হয়েছে বিশ্রাম হাউজ, রেস্টুরেন্ট, রান্নাঘর, শয়নকক্ষ, দোলনা ও শৌচাগারসহ নানা স্থাপনা। বিনা টিকিটে এই পার্কে বেড়ানো যায়। বর্তমানে এই পার্ককে আরও আধুনিকায়ন করা হয়েছে।

চাঁনপুর-বৈলগাঁও চা বাগান

শহর থেকে কাছেই, প্রকৃতির রূপ সৌন্দর্য এখানে নিজেকে সাজিয়েছে মনের মতো করে। প্রায় সাড়ে তিন হাজার একর জায়গা জুড়ে সাজানো বৈলগাঁও চা-বাগান শত বছরের ঐতিহ্যের অংশ। ক্লোন চায়ের জন্যে এই বাগানে উৎপাদিত চায়ের কদর দেশ ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী। বাঁশখালী উপজেলার পুকুরিয়া ইউনিয়নে অবস্থিত এই চা-বাগানের সৌন্দর্য ভ্রমণ পিপাসুদের মুগ্ধ করে। বৈচিত্রময় পাহাড়ি টিলাগুলো দূর থেকে দেখলে মনে হবে ‘সবুজ টুপি’ পড়ে আছে।

৩ লক্ষ ২৫ হাজার কেজি পাতা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এগিয়ে চলা এই চা-বাগানে চা-পাতা প্রক্রিয়াজাত করণ করার দৃশ্যটিও অনুমতি নেয়া সাপেক্ষে দেখতে পারেন ভ্রমণকারীরা। সিটি গ্রুপের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এই বিস্তৃত চা বাগানটির সবুজের গালিচা পয়সা উসুল একটি দিন উপহার দিতে পারে নিমেষেই। সকালটি চা বাগানের সবুজাভ আথিতেয়তা নিয়ে বিস্মিত হয়ে আসতে পারেন বাঁশখালীর উপকূল জুড়ে ৩৫ কিলোমিটার বিস্তৃত একটানা সমুদ্র সৈকতটি অবলোকন করে।

বাঁশখালী সমুদ্র সৈকত

খানখানাবাদ, কদমরসুল, কাথরিয়া, বাহারছড়া, রত্নপুর, সরল, গন্ডামারা সহ ছয় সাতটি পয়েন্ট সেজে আছে আপন রূপ মাধুর্যে। বিকেল হলে এখানে পর্যটকের ঢল নামে। ঝাউবাগানের শাঁ শাঁ দক্ষিণা হাওয়ায় সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে সারাটি বিকেল কাটিয়ে দিতে পারেন। বালুকাবেলায় একেঁ দিতে পারেন একটি বিকেল কাটানোর শিল্পিত চিহ্ন। এই সমুদ্র সৈকতটি সম্পর্কে বৃহৎ পরিসরে প্রচার এবং পর্যটকদের জন্য থাকার ব্যবস্থা করা গেলে কোনো অংশে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত থেকে পিছিয়ে থাকবে না।

ছনুয়া কাতেব শাহ্ (রহ:) জামে মসজিদ

বাঁশখালীর ছনুয়া ইউনিয়নের কাতেব পাড়ায় হাজার বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য কাতেবী জামে মসজিদের অবস্থান। কাতেব আউলিয়ার স্মৃতি বিজড়িত ছোট-বড় মোট ২১ গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদ। যে মসজিদে হিন্দু-মুসলমানসহ প্রায় ধর্মালম্বীর মানুষ যায় মানত করতে। এই মসজিদে গায়েবী আজান হয় বলেও কথিত আছে। তাই এটিকে অনেকে গায়েবী মসজিদ নামেও চেনে। এই মসজিদে মানত করলে আশানুরূপ ফল পাওয়া যায় বলে কথিত আছে। বাঁশখালীর কৃতি সন্তান প্রফেসর ইমেরিটার্স ড. আবদুল করিমের ‘বাঁশখালীর ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ‘কোন লোক এই মসজিদে ঢুকে সত্য লুকায়িত করে যদি মিথ্যা শপথ করে; সাথে সাথে ঐ ব্যক্তি মৃত্যু কিংবা অন্য কোন বিপদের সম্মুখীন হবেন।’

তাছাড়া, হাজার বছরের পুরনো স্থাপনা ‘বখশি হামিদ মসজিদ’, ঐতিহাসিক মলকা বানুর মসজিদ ও দিঘী, নাপোড়া অর্গানিক ইকো ভিলেজ, লবণ ও শুটকি শিল্প, চিংড়ি মাছের ঘের, বাঁশখালীর বিখ্যাত লিচু বাগানও দেখে যেতে পারেন উপরি পাওয়া হিসেবে।

সকালটা চা বাগানে, দুপুরটা ইকোপার্ক-ইকোভিলেজ আর বিকেলটা সমুদ্রকে সঁপে দিয়ে একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে ফিরে আসা যায় শহরে।

যেভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে যেকোন পথে চট্টগ্রাম হয়ে বাঁশখালী যাওয়া যায়। চট্টগ্রামের বদ্দারহাট বাস টার্মিনাল থেকে বাঁশখালী স্পেশাল সার্ভিস ও ক্লোজ ডোর সার্ভিস নামে দুটি বাস ছাড়ে প্রতি ২০ মিনিট পর পর। মাত্র ৬০-৮০ টাকা ভাড়ায় বাঁশখালী ঘণ্টা দেড়েকের দূরত্বে। মাইক্রোবাস ভাড়া নিয়ে নিতে পারেন সারাদিনের চুক্তিতে। তারা আপনাকে সবগুলো স্পট একদিনেই ঘুরিয়ে আনতে পারে।

কোথায় থাকবেন

বাঁশখালী ইকোপার্ক-এ রাত্রি যাপনের জন্য হিলটপ কটেজ ও ঐরাবতী বন বিশ্রামাগার নামে বনবিভাগের দুইটি বিশ্রামাগার আছে। সেখানে থাকতে পারেন অনায়াসে।

মহানগর নিউজ/এআই