বৃহস্পতিবার ০২ ডিসেম্বর ২০২১

| অগ্রাহায়ণ ১৮ ১৪২৮

মহানগর নিউজ :: Mohanagar News

প্রকাশের সময়:
১৫:১৬, ১৪ নভেম্বর ২০২১

সুস্মিতা বড়ুয়া

বৃহত্ত্বের আঙিনায় ‘মুক্তি’

প্রকাশের সময়: ১৫:১৬, ১৪ নভেম্বর ২০২১

সুস্মিতা বড়ুয়া

বৃহত্ত্বের আঙিনায় ‘মুক্তি’

প্রকৃতি তার নিজ লহমায় সৌন্দর্যের আবাসন গড়ে তোলে, অন্যদিকে মানুষ তার প্রয়োজনে প্রকৃতিকে ব্যবহার করে অর্থনৈতিক চাকাকে সচল রাখে। জীবন ভরসাম্যের এই দোলাচলে পরিবেশ তার ভারসাম্যের মুক্তি খোঁজে, যার অগ্রযাত্রায় কাজ করে কিছু দিকপাল। অন্ধকারের মাঝে তারা আলোর সারথী। বৃহত্ত্ব আর্ট ফাউন্ডেশন, সেই স্বপ্ন সারথীর নাম।

দীর্ঘ মহামারির অন্ধকারের পর, শিল্প-প্রকৃতি আর থমকে যাওয়া যাপিত জীবনকে একত্রিত করার অন্যতম প্রয়াস বৃহত্ত্বের 'আয় তবে সহচরী'। স্কুলের গণ্ডিতে আসতে না পারার সীমাবদ্ধতাকে টপকে, শ্রমিক শিশুটিও স্বপ্ন দেখে বিদেশ ঘোরার, বিশ্বকে জয় করার, স্বপ্ন দেখে একজন শিল্পী হওয়ার। সৃজনশীল চর্চার বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ, আন্তরিকতা, স্বকীয়তা আর সুজনের পসরা একত্রিত হয়েছে কোমল হাতের রং-তুলির আঁচড়ে। সাদা ক্যানভাস রঙিন হয়েছে প্রকৃতির সবুজাভ রঙে, একদিকে রংধনু'র রং অন্যদিকে করোনার ভয়াল থাবার চিহ্ন রেখে যাওয়ার সতর্কবার্তা। 

ইট-পাথরের শহরেও যে চাইলে প্রাকৃতিক নির্মল হাওয়া বইতে পারে, তা এই শিশুদের কাজে প্রকাশ পায়। সর্বোপরি, মা, ভাষা, প্রকৃতি মিলে মিশে একাকার।

শিল্পী আফিয়া নূর, মাহামুদা  সিদ্দিকা, মোহাম্মদ মোজাহিদুর রহমান সরকার, রাসেল রানা এবং শিল্পী তপন ঘোষের কাজের মধ্য দিয়ে বৃহত্ত্ব আর্ট ফাউন্ডেশন'র স্থান পরিবর্তনের যাত্রা শুরু হয়েছে ।

'মুক্তি' শিরোনামে হাজারীবাগ ট্যানারিতে। যা স্থানীয় সবার কাছে 'মুক্তি বিল্ডিং' নামে পরিচিত। ফাউন্ড অবজেক্ট নিয়ে কাজ করার নিমিত্তে ‘খুঁজিয়া দেখো তাই...’ এর কিউরেটর এবং প্রদর্শনীর আর্ট ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করেন শিল্পী বিশ্বজিৎ গোস্বামী। 

মা যেমন তার সর্বোচ্চটুকু দিয়ে সন্তানকে রক্ষা করে পৃথিবীর আলোর মুখ দেখায়, তেমনি বৃহত্ত্ব আর্ট ফাউন্ডেশন আজ এমন একটি জায়গায় যা শত বছরের দূষণের নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে বেড়ে উঠা দিগন্তের খোলা আকাশ, সবুজ ছায়া।

ট্যাপেস্ট্রির বুননে শিল্পী আফিয়া নূর তার "Transformation" কাজটি তুলে ধরেছেন। হাজারীবাগ ট্যানারির মূল উপাদান যে চামড়া, চামড়ার মূল উপজীব্য গৃহপালিত প্রাণি গরু, ছাগল, মহিষ - এসব প্রাণির জীবন শুরু থেকে শেষ উপাদানটি পর্যন্ত আমাদের ব্যবহার্য। এই প্রাণিগুলোর জীবন চক্র এবং চামড়া প্রস্ততকরণের মূল উপাদান লবণ, সামগ্রিক ভাবে শ্রদ্ধা প্রদর্শন স্বরূপ ফুটে উঠেছ শিল্পী মোজাহিদুর রাহমানের "Ensemble" শিরোনামের কাজে।

অস্তিত্বের সংকট আর দায়বদ্ধতার মধ্যে থেকেও হাজারীবাগ ট্যানারি একদিন তার নিজস্ব পরিবেশে ফিরবে প্রকৃতির সব উপাদানের সমারোহে। ট্যানারির থেকে প্রাপ্ত উপাদান দিয়ে সন্নিবেশ করে শিল্পী রাসেল রানা তার '' Breathing In and Out" শিরোনামের কাজটি তুলে ধরেছেন। শিল্পী তপন ঘোষ ট্যানারির Found Object এর ব্যবহারে শূন্যতা, ইতিবাচকতাকে গ্রহণ করতে পারার ক্ষমতা এবং নতুন সম্ভাবনার দিক নির্দেশ করেছেন তার "Recast" শিরোনামে কাজের মধ্য দিয়ে। 

বাংলাদেশ বিজয়ের ৫০ বছর পূর্তি এবং অন্ধকার, ধ্বংস হতে যাওয়া পরিসরের মাঝে নতুন আশার আলো হয়ে বৃহত্ত্বের নতুন পথচলায় হাজারো প্রাণের উচ্ছাস, শিল্প জগতে এটি এক নতুন দিগন্তের সূচনা "মুক্তি"। যা মিলে-মিশে এক হয়েছে বৃহত্ত্বের ভবিষ্যত স্বপ্নের বাস্তব পথচলায় শিল্পী মাহমুদা সিদ্দীকার কাজে।

মানুষের শরীরের নয়টি ছিদ্রের মতো ইটের দেয়ালের উপর আকাশের দিকে তাকিয়ে 'আট কুঠুরি, নয় দরজা', প্রাণিজ প্রাণের উপস্থিতিতে আশ্রিতা 'মা' - পুরোনো রূপকে সাথে নিয়ে মা, মাটি, মানুষ, ভাষা, স্বদেশ, প্রকৃতির সাথে বৃহত্ত্বের শিল্প পরিসর দিগন্তে ছড়াবে। অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের শিল্প সংস্কৃতির এগিয়ে যাওয়ায় " মুক্তি" প্রদর্শনী একটি নতুন দ্বার।
 

  লেখক : স্বাধীন গবেষক, শিল্প সমালোচক 

কেডি