বুধবার ১৯ জানুয়ারি ২০২২

| মাঘ ৬ ১৪২৮

মহানগর নিউজ :: Mohanagar News

প্রকাশের সময়:
২১:১৩, ১৩ জানুয়ারি ২০২২

সরোজ আহমেদ

একাত্তরের রণাঙ্গন কাঁপানো কিশোরযোদ্ধার গল্প—পর্ব ৩

প্রকাশের সময়: ২১:১৩, ১৩ জানুয়ারি ২০২২

সরোজ আহমেদ

একাত্তরের রণাঙ্গন কাঁপানো কিশোরযোদ্ধার গল্প—পর্ব ৩

পৃথিবীর বুকে নিজের পরিচয়ে দাঁড়াতে মানুষকে কত বিপ্লব, সংগ্রাম করতে হয়েছে যুগের পরে যুগ। শুধু একখণ্ড মুক্ত মানচিত্রের আশায় কত জীবন যে ঝরে গেছে তার হিসেব নেই। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এদেশ শত্রুমুক্ত করেছে ছাত্র-শিক্ষক, যুবক, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিক, পুলিশ, ইপিআর, আনসার, সেনাবাহিনীর জোয়ান, কৃষক-শ্রমিক তথা স্বাধীনতাকামী মানুষ। এ যুদ্ধে অনেক রক্তক্ষয় ও  ত্যাগ-তিতিক্ষার পর আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। পেয়েছি লাল-সবুজের পতাকা, একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। আমাদের সবার প্রিয় মাতৃভূমি, বাংলাদেশ।

সেই যুদ্ধের গল্প তো আমরা অনেকই শুনেছি। কিন্তু এটা কি জানি, দীর্ঘ নয় মাসব্যাপী এই যুদ্ধে বড়দের মতো লড়াই করেছে অগণিত শিশু-কিশোরও? তারা কখনও সরাসরি যুদ্ধ করেছে, কখনও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহযোগিতা করেছে। কেউ কেউ জীবনবাজি রেখে গ্রেনেড হাতে ছুটে গেছে পাকিস্তানি সেনাক্যাম্পে। পলকেই উড়িয়ে দিয়েছে শত্রুদের আস্তানা।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের মধ্যে প্রায় ৪ লাখই ছিল শিশু-কিশোর। আর যে সব নারী সম্ভ্রম হারিয়েছিল তাদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই ছিল কিশোরি। তাই, মুক্তিযুদ্ধে শিশু-কিশোরদের অবদান কিছুতেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। 

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দেশমাতৃকার জন্য লড়াই করা দুরন্ত এবং দুর্ধর্ষ কিশোর মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের গল্প ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। আজ ছাপা হলো দ্বিতীয় পর্ব।

আবু সালেক

বাংলার আরেক কিশোর যোদ্ধা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হাশিমপুরের সন্তান কিশোর আবু সালেক। ১৯৭১ সালে তিনি কসবা উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। বয়স মাত্র বারো। এমন দুরন্ত বয়সে খেলাধুলা, ছোটাছুটি করার সময়। কিন্তু এসময় শুরু হয়ে গেল দেশ রক্ষার যুদ্ধ। যুদ্ধের সময় ভাদ্র মাসের প্রথম সপ্তাহে আবু সালেকের বাবা আবুল হাশিম, চাচা আবদুল খালেক, গোলাম মাওলা, চাচাতো ভাই তারাচানসহ টানমান্দাইল ও জাঙ্গাল গ্রামের ৩৩ জন সাধারণ মানুষকে স্থানীয় গঙ্গাসাগর দীঘির পাড়ে ধরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়েছিল। এর আগে তাদের দিয়েই গর্ত খোঁড়ানো হয়। ওই ফায়ারিং স্কোয়াড থেকে সালেকের বড় ভাই আবুল খায়ের মাস্টার ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। আবুল খায়েরকে মৃত ভাবা হয়েছিল। পরে ভাসতে ভাসতে গঙ্গাসাগর দীঘি পাড় হয়ে বাড়িতে ফিরেছিলেন তিনি।

চারদিকে চলছে জ্বালাও-পোড়াও। বাবা, চাচাসহ ৩৩ জনের গণহত্যার প্রতিশোধস্পৃহা জেগে ওঠে কিশোর আবু সালেকের মনে। তখন তাকে আর ঠেকায় কে! প্রশিক্ষণ নিতে সীমানা পেরিয়ে পালিয়ে গেলেন আগরতলায়। সেখানে তখন মুক্তিযোদ্ধাদের বাছাই করা হচ্ছিল। কিন্তু আবু সালেক তো একদম ছোট বাচ্চা! ওকে কেউ-ই নিতে চাইল না। বাড়ি ছেড়ে এত কষ্ট করে এসে শুনে কী তাঁকে যুদ্ধে নেয়া যাবে না। আর তাই শুনে সালেক তো একেবারে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। কান্না দেখে দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসারদের মন গলে যায়। ফলে তাঁকে আর বাদ দিতে পারলেন না। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নাম লেখালেন ছোট্ট আবু সালেক। এরপর সালেক প্রমাণ করে দিলেন, বয়সে ছোট হলেও কৌশল এবং সাহসিকতায় বড়দের চেয়ে তিনি কোনও অংশে কম না। 

প্রথমে প্রশিক্ষণের জন্য আগরতলা থেকে ছোট্ট আবু সালেক নিয়ে যাওয়া হয় মেলাঘর ক্যাম্পে। অনেক দূর পাহাড়ি পথ পেরিয়ে দিন শেষে প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে পৌঁছে। সেখানে ২১ দিন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তারপর দেশে ফিরে বড় বড় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শুরু করলেন যুদ্ধ; পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ, বাংলাদেশকে স্বাধীন করার যুদ্ধ। 

কিশোরযোদ্ধা আবু সালেক বেশ কয়েকটি অপারশনে সফল হয়। একদিন সুবেদার আব্দুল আওয়ালের নেতৃত্বে তাঁরা অভিযানে যান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার উজানিসা এলাকায়। সেখানে কুমিল্লা সিলেট মহাসড়কের ওপর একটি ব্রিজ রয়েছে। সিলেটের সঙ্গে চট্টগ্রাম বিভাগের যোগাযোগ এই ব্রিজ দিয়ে। সবচেয়ে বড় কথা ভারতে প্রশিক্ষণ শেষে এই ব্রিজের নিচ দিয়েই মুক্তিযোদ্ধাদের দেশে প্রবেশ করতে হয়। এমনকী শরণার্থীদের ভারতে যেতে হয় এই পথ দিয়ে। তখন ব্রিজটি ধ্বংস করা জরুরি হয়ে পড়ে। নইলে পাকিস্তানি সৈন্যদের চলাচলের কারণে এই পথ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা নির্বিঘেœ যাতায়াত করতে পারছিল না। 

অধিনায়কের নির্দেশমতো আবু সালেকরা রাত আনুমানিক ১২টায় ব্রিজ এলাকায় পৌঁছান। তারপর ব্রিজের নিচে দক্ষিণ দিকে হাই এক্সপ্লোসিভ সেট করা হয়। রাস্তায় পোঁতা হয় মাইন। কিন্তু অনেক সময় পেরিয়ে গেলেও সেদিন পাকিস্তানি সৈন্যের কোনও গাড়ি ব্রিজের কাছে আসছিল না। অপেক্ষার পর অপেক্ষা। তখন রাত আনুমানিক আড়াইটা। দেখা গেল সৈন্যদের একটি গাড়ি ব্রিজের দিকে আসছে। গাড়িটা ব্রিজের কাছাকাছি আসতেই গুলি চালানোর নির্দেশ দিলেন অধিনায়ক। একই সঙ্গে ব্রিজটিও উড়িয়ে দেয়া হয়। মিশন সাকসেস, সেই অভিযানে ৪-৫ জন পাকিস্তানি সৈন্য কপোকাত।      

এরপর একদিন ওরা যুদ্ধ করছিলেন চন্দ্রপুর গ্রামে। আবু সালেক সেই যুদ্ধে ছিলেন বাঙ্কারে। মধ্যরাত থেকে শুরু হয় সে এক ভীষণ যুদ্ধ। দু’পক্ষের মধ্যে বৃষ্টির মত গুলি চলতে থাকে। তবে পাকিস্তানিদের অবস্থান ছিল মাত্র কয়েকশ’ গজ দূরে। তারা বেশ সুবিধাজনক অবস্থানেও ছিল। আবু সালেকের দলের অবস্থান ছিল বেশ বেকায়দায়। এই অবস্থায় ওদের টিকে থাকাই মুশকিল হয়ে পড়ে। তখন বাঁচতে হলে ওদের সামনে একটাই পথ, পিছু হটতে হবে। কিন্তু চাইলেই তো আর পিছু হটা যায় না। একজনকে তো ব্যাকআপ দিতে হবে। নইলে যে সবাই মারা পড়বেন। কে এই মরণফাঁদে পড়ে থেকে অনবরত গুলি করে শত্রুদের চোখে ধুলো দেবে? আর এই ফাঁকে অন্যরা সরে যাবে নিরাপদ জায়গায়। কারও মুখে জবাব নেই। হঠাৎ এগিয়ে এলেন সবার ছোট আবু সালেক। ছোট্ট কাঁধে তুলে নিলেন বিশাল এক দায়িত্ব। পাকবাহিনীর ক্যাম্প লক্ষ্য করে ক্রমাগত গুলি করতে লাগল সালেক। আর সেই ফাঁকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে গেলেন অন্যরা। 

টানা গুলি বর্ষণে পাক আর্মিরা বোকা বনে গেল। ওরা মনে করল, মুক্তিযোদ্ধারা মনে হয় খুব সুসংগঠিতভাবে আক্রমণ চালাচ্ছে। ফলে ভয়ে ওরাও পিছু হটে। সারারাত বাঙ্কারে থেকে শুধু আবু সালেক একাই গুলি ছোঁড়ে পাকিস্তানি সেনাদের মনোবল ভেঙে দিলেন। 

একসময় রাত শেষ হয়ে সকাল হলো। মুক্তিযোদ্ধারা ভাবলেন, গোলাগুলি যখন থেমেছে, আবু সালেক নিশ্চয়ই শহীদ হয়েছে। কিন্তু বাঙ্কারে গিয়ে তো সবাই অবাক! সেখানে কিশোর আবু সালেক অক্ষত অবস্থায় বেশ আয়েশীভাব নিয়ে একা বসে আছেন। সালেককে অক্ষত দেখে সহযোদ্ধারা যে কী খুশি হলেন বলার অপেক্ষা রাখে না! এমন সাহসী একজন কিশোর যদি যুদ্ধে মারা যায়, সে কী কারও ভালো লাগবে বলো? এই বীরত্বের প্রতিদানও অবশ্য আবু সালেক পেয়েছেন। তাঁকে দেওয়া হয় বীর প্রতীক উপাধি।

এআই