বুধবার ১৯ জানুয়ারি ২০২২

| মাঘ ৬ ১৪২৮

মহানগর নিউজ :: Mohanagar News

প্রকাশের সময়:
১৯:০১, ৬ জানুয়ারি ২০২২

আলমগীর মোহাম্মদ

প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা এখনও বঞ্চিত

প্রকাশের সময়: ১৯:০১, ৬ জানুয়ারি ২০২২

আলমগীর মোহাম্মদ

প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা এখনও বঞ্চিত

হুমায়ূন আহমেদের ১৯৭১ উপন্যাসের নাট্যরূপ হলো ১৯৭১ নাটকটি। নাট্যাভিনেতা আবুল হায়াতের আগ্রহে লেখক এই কাজটি করেন। কিন্তু কী এক অজ্ঞাত কারণে নাটকটির মঞ্চায়ন হয়নি।

মঞ্চের জন্য করা মূলত। ইরাজ নামে একজন পাগলচরিত্র আছে সেখানে। সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত ও নজরকাড়া যুবক সে। জনমুখে পাগল হলেও সে নিজেকে পাগল মানতে চায় না। তবে নিজের মাথাগরমের কথা সবাইকে বলে বেড়ায়। গরমকাল এলে গলা পানিতে দাঁড়িয়ে থেকে মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করে। লোকমুখে পাগল অথচ সবচেয়ে চতুর ও নির্ভীক এই চরিত্র আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় স্যামুয়েল বেকেটের সেই চিরায়ত উক্তি, ‘আমরা সবাই জন্মপাগল, কেউ কেউ রয়ে যাই।’

ইরাজ পাক আর্মির মেজরকে থোড়াই কেয়ার করে এবং মুখের ওপর পটাপট সত্যটা বলে দেয়। এই জায়গায় সে আজিজ মাস্টার, কেন্দ্রীয় চরিত্রের সাথে নিজের পার্থক্য বুঝিয়ে দেয়। শিক্ষিত সমাজ মূলত সুবিধাবাদী, শিক্ষকরা একটু বেশিই। আপাতদৃষ্টিতে নির্বিবাদী মনে হলেও এরা আসলে নিজেদের এক্সপেডিয়েন্ট চরিত্রের কারণে বড় কোনো কিছুতে অংশগ্রহণ করতে পারে না। আজিজ যেখানে মেজরকে কথায় কথায় ‘ইউ আর আ ভেরি কাইন্ড পার্সন’ বলে ফেনা তুলছিল তখন ইরাজ স্ব-গতিতে হরহর করে বলে যায় সকল সত্য। এলাকাবাসীর স্বাধীনতার প্রতি আজন্ম ইচ্ছার কথা। 

ইরাজ শওকত আলীর ‘পাকা দেখা’ উপন্যাসের রাতুলের মতো। নিজের কথা হরহর করে বলে দেয়। কোনো সংকোচ ছাড়াই। মেজর তাকে চা খেতে বললে স্বভাবের খেয়ালে জবাব দেয়, ‘আমি চা খাই না। এমিনিতেই শরীর হট থাকে।’ 

রফিককে আপাতদৃষ্টিতে কোলাবোরেটর মনে হলেও সে চালাকি করে পাক মেজরকে গ্রামের দিকে নিয়ে আসেন দেশাত্মবোধ থেকে। অনেক জল গড়িয়ে যাওয়ার পর মেজর রফিককে বুঝতে পারে এবং তাঁকে শাস্তি দেওয়ার কথা জানায়। রফিক জানেন বড় বড় মানুষের ভিড়ে তাঁর অবদান, আত্মত্যাগ জাতি স্মরণ করবে না। তবুও তিনি তাঁর সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করে যান দেশের জন্য, স্বাধীনতার জন্য।

দারিদ্র্য একটা মহা অভিশাপের নাম। আজিজ মাস্টার দারিদ্র্যের কবলে পড়ে আত্মসম্মান হারান। লজিং ছাত্রীর প্রেমে পড়ে যান। ঠিক সে কারণে তাঁর রাজাকার শ্বশুর (পরবর্তীতে তাদের বিয়ে হয় মেজরের খেয়ালের বশে) তাঁকে কথায় কথায় ছোট করে এবং থামিয়ে দেয়। এভাবে আশ্রিত  আজিজ মাস্টারের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর একসময় রুদ্ধ হয়ে যায় এবং একজন মধ্যবিত্ত সুবিধাবাদী চরিত্রে পরিণত হন। অথচ নাটকের শুরুতে আমরা তাঁকে পাই প্রতিশ্রুতিশীল একজন ইংরেজি জানা যুবক, যে কিনা আবার কবিতা লেখে। দেশ, স্বাধীনতা, স্বাধীকার প্রভৃতি বিষয়ে অন্য দশজনের চেয়ে স্বতন্ত্রভাবে চিন্তা করতে পারে।

নাটকের ঘটনা যেখানে সংঘটিত হয় সে অঞ্চলের হিন্দু বাসিন্দারাই মূল আক্রান্ত হয়। তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। রফিক যখন পাক মেজরের হাতে স্বাধীনতার জন্য তাঁর গোপন পরিকল্পনার জন্য হাতেনাতে ধরা খান তখন তিনি একবারও চিন্তা করেন না তাঁর কথা অন্যরা স্মরণ করবে কিনা। নাট্যকার আক্ষেপ করে লিখেন, ‘দেশ স্বাধীনের এত বছর পরেও প্রকৃত ত্যাগী মুক্তিযোদ্ধারা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত।’

লেখক : শিক্ষক ও অনুবাদক

মহানগর নিউজ/এআই